হুসাইন বিন আফতাব, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা : দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের আকাশে এখন আর ভেসে বেড়াতে দেখা যায় না চিরচেনা শকুনের ঝাঁক। একসময় নদ-নদীর চর, বিস্তীর্ণ মাঠ কিংবা বড় গাছের মগডালে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে দেখা যেত এই পাখিকে। এখন বাস্তবে নয়, বইয়ের পাতা কিংবা ছবিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে ‘প্রকৃতির সুইপার’ খ্যাত শকুন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হতে পারে শকুন। বাস্তবের আকাশে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তখন স্কুল-কলেজে ছবি দেখিয়ে এই পাখি চেনাতে হবে। বর্তমানে সরু ঠোঁট প্রজাতির শকুনসহ হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতি কোনোরকমে টিকে আছে। শকুন মৃত পশু-পাখি খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিস্তার রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণেই একে বলা হয় ‘প্রকৃতির সুইপার’। চিল, ঈগল বা বাজপাখির মতো শিকারি নয়; জীবিত মানুষ বা প্রাণী আক্রমণ করে না। বরং মৃতদেহ দ্রুত অপসারণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

বিশ্বে মোট ২৩ প্রজাতির শকুন থাকলেও বাংলাদেশে দেখা যায় মাত্র সাত প্রজাতি। এর অধিকাংশই এখন বিলুপ্তপ্রায়। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, সত্তরের দশক থেকে এ পর্যন্ত দেশে শকুনের সংখ্যা প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে গেছে। উপমহাদেশে গত তিন দশকে প্রায় ৯৭ শতাংশ শকুন বিলুপ্ত হয়েছে।

আশির দশকেও দক্ষিণাঞ্চলের নদীতটে দলবেঁধে আসত শকুনের ঝাঁক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন স্থানে ভেসে আসা লাশের ওপর ধূসর শকুনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামে কোনো গরু মারা গেলে আকাশে চক্কর দিতে দেখা যেত শকুন-শকুনিকে। প্রখর দৃষ্টিশক্তির অধিকারী এই পাখি বট, কড়ই, শিমুল, দেবদারু ও বাঁশঝাড়ে বাসা বাঁধত। অনেক উঁচু থেকে মাটি বা পানির ওপর থাকা খাদ্য দেখতে সক্ষম শকুনের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল প্রায় ২৫ বছর। তিন থেকে চার ফুট উচ্চতার এ পাখি সাধারণত একাধিক ডিম পাড়ে এবং কয়েক সপ্তাহ তাপ দেওয়ার পর বাচ্চা ফুটে। বন্য প্রাণী ও পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শকুন বিলুপ্তির পেছনে অন্যতম কারণ হলো ডাইক্লোফেনাক নামের ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার। গবাদি পশুকে এই ওষুধ প্রয়োগের পর সেই পশু মারা গেলে তার মাংস খাওয়ার মাধ্যমে শকুনের কিডনি বিকল হয়ে ২-৩ দিনের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে। এ ছাড়া বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট ও কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে শকুনের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশে প্রায় দুই শতাধিক পাখি প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে; এর মধ্যে শকুন অন্যতম।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শ্যামনগর উপজেলা আমির মাওলানা আব্দুর রহমান বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে শকুন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়া এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়, বৃক্ষ নিধন, জমির ব্যবহার পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে শকুন তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে।তিনি বলেন, “কৃষিজমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে শকুন নিরাপদে বাসা বাঁধতে ও খাদ্য সংগ্রহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শকুন কেবল একটি পাখি নয়, পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের অভাবে রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে, যা মানুষের জন্যও হুমকি।” তিনি আরও বলেন, শকুন সংরক্ষণে উন্মুক্ত স্থান ও বনাঞ্চল রক্ষা, নতুন বন অঞ্চল সৃষ্টি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় এই পাখির পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব।

পরিবেশবিদদের মতে, শকুন সংরক্ষণে ডাইক্লোফেনাকের বিকল্প ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্যভূমি (ভালচার সেফ জোন) তৈরি, বড় গাছ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। প্রকৃতির এই পরিশ্রমী ‘সুইপার’কে রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্যে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—এখনই উদ্যোগ না নিলে দক্ষিণ উপকূলের আকাশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে শকুনের ছায়া।