বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি এ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এখনো দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হলো কৃষি। অন্যদিকে পরোক্ষভাবেও কৃষির সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের । সে বিবেচনায় কৃষি ছাড়া সামগ্রিক উন্নয়ন কখনই সম্ভবপর নয়।
কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন আনয়ন করার জন্য ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশ (বিএডিসি) এর যাত্রা শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিলো কৃষির অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ যেমন: বিভিন্ন ফসলের মানসম্পন্ন বীজ, সুষম সার এবং ভূ-গর্ভস্থ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ সুবিধাদি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। এ কাজটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিএডিসি কার্যকরভাবে সম্পাদন করে যাচ্ছে। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বিএডিসি হয়ে উঠেছে অন্যতম একটি নিবেদিত সংস্থা।
দক্ষ সেচ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বিএডিসির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৬০ এর দশকে মাত্র ১,৫৫৫টি শক্তিচালিত পাম্পের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারের লক্ষ্যে দেশে আধুনিক ও কৃষি যান্ত্রিকরণ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ১৯৬৭-৬৮ সালে ১০২টি গভীর নলকূপ এবং ১৯৭৩-৭৪ সালে ১৯৯৮টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করে ভূ-গর্ভস্থ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। এরপর হতে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে। বিএডিসি’র মাধ্যমে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে সারা দেশে ২০২৪-২৫ সেচ মৌসুমে ৭.২৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে দুই ধরণের সেচ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। সেচ মৌসুমে ক্ষুদ্রসেচের মাধ্যমে ৯৫% এবং বৃহৎ সেচের মাধ্যমে ৫% জমিতে সেচ প্রদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ভূ-উপরিস্থ পানির সাহায্যে ২৭.৯৯% এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির সাহায্যে ৭২.০১% জমিতে সেচ সুবিধাদি প্রদান করা হচ্ছে (বিএডিসি’র ক্ষুদ্রসেচ সার্ভে রিপোর্ট, ২০২৪-২৫)।
বিভিন্ন ধরনের সেচ সুবিধাদির মাধ্যমে বিএডিসি’ এ সেচ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো: খাল নালা পুনঃখনন, এবং ভূ-উপরিস্থ সেচনালা ও ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা (ব্যারিড পাইপ) নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো, ফসল রক্ষা বাঁধ, ঝিরি বাঁধ নির্মাণ, বিভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন ও পুনর্বাসন, সৌর শক্তি চালিত সেচ পাম্প, ডাগওয়েল স্থাপন, রাবার ড্যাম নির্মাণ ইত্যাদি। বিভিন্ন চলমান প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিএডিসি সারা দেশে এ সেচ কার্যক্রম পরিচালিত করে আসছে। গত এক দশকে বিএডিসি’র আওতায় প্রায় ১৩,৬৬৫ কি.মি. খাল নালা পুনঃখনন, ১৪,৬৩৭ কি.মি. ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ৩,৬১০ কি.মি. ভূ-উপরিস্থ সেচ নালা নির্মাণ, ৩২১ কি.মি. ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, ১৪২৬০ টি বিভিন্ন ধরণের সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, প্রায় ১৪,০০০ সংখ্যক গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন ও পুনর্বাসন, ৯,৬৫১টি শক্তি চালিত/ভাসমান পাম্প ক্ষেত্রায়ণ, ৭৮৬ টি সৌর শক্তি চালিত সেচ পাম্প স্থাপন, ৪৮৩ টি সৌর শক্তি চালিত ডাগওয়েল স্থাপন, ৬৮টি ডাগওয়েল স্থাপন, ১৪টি রাবার ড্যাম ও ০২টি হাইড্রেলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ, ৩৬টি নিরাপদ ফুল ও সবজি উৎপাদনে পলিশেড নির্মাণসহ অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর পরীবেক্ষণের লক্ষ্যে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ৪০০টি ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর মনিটরিং ডাটা লগার স্থাপনসহ পানির টেকসই ব্যবহার এবং পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। দক্ষ সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেচের পানির অপচয় রোধ করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেচ খরচ হ্রাসের লক্ষ্যে বিএডিসি কাজ করে আসছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির সীমাহীন উত্তোলন নিরুৎসাহিতকরণ, ভূগর্ভে পানির পুনর্ভরণ এর ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কৃষিকাজে ‘ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১৮’ অনুমোদিত হয়। বিএডিসির সেচ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরো টেকসইপূর্বক সরকার ঘোষিত বিভিন্ন পরিকল্পনা যেমন: এসডিজি এবং শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনমূখী কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টি চলমান রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সেচ দক্ষতা ৩৮% হতে ৪০% এ উন্নীতককরণ, সেচ কাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার ৩০% এ উন্নীতকরণ এবং একইসঙ্গে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার ৭০% এ হ্রাসকরণে বিএডিসি বদ্ধপরিকর।
দেশে আবাদি জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়ছে উৎপাদন চাহিদা। ফলে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা পূরণে আব্যশক টেকসই ও লাভজনক কৃষিব্যবস্থা। এক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক হলো নিরাপদ ও দক্ষ সেচ ব্যবস্থাপনা। আর সেজন্য বিএডিসি’র সেচ উইং সারাদেশের কৃষকের নিকট সেচ সুবিধাদি যথাসময়ে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিয়ে কৃষি ও কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। দক্ষ সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষককের নিকট সেচ সুবিধা প্রদানে বিএডিসি’র ভূমিকা অনন্য ও অনবদ্য। প্রেসবিজ্ঞপ্তি।