দেশের বিরুদ্ধে সকল ষড়যস্ত্র রুখে দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে সারাদেশে উদযাপিত হয়েছে মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের ৫৪তম বছরে মঙ্গলবার ভোর থেকেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, কুচকাওয়াজ, আলোচনাসভা, বিজয় মেলা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। রাজনীতিবিদসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষের ঢল নামে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে হাজার হাজার মানুষ বীর শহীদদের স্মরণ করতে ছুটে আসেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। এর আগে ভোরে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সাধারণ মানুষ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।
হাতে ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে পর্যায়ক্রমে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বেলা বাড়ার সঙ্গে লাখো জনতার ঢল নামে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। বিভিন্ন বয়স এবং শ্রেণি-পেশার লোকজনের পাশাপাশি এদিন জাতীয় স্মৃতিসৌধে শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
জাতীয় পতাকার ছবির পাশাপাশি স্মৃতিসৌধের ছবি এঁকেছেন কেউ কেউ। শীতকে উপেক্ষা করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধে আসেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারাও। অনেকের পোশাকেও দেখা গেছে লাল-সবুজের বাহারি উপস্থিতি। এসব বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অনেকে দেখা করতে আসেন। তাদের সালাম জানান।
এর আগে, মহান বিজয় দিবসে সকাল ৬টা ৩৩ মিনিটে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন এবং সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসময় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করে এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে শহীদদের সম্মানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এছাড়া এদিন স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ফুল দিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, একটা বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্নটা আমাদের এখনো অধরা রয়ে গেছে, সেটি আমরা পূর্ণতার দিকে যাত্রাটা শুরু করতে পারব।
স্মৃতি সৌধে ফুল দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, নির্বাচনের আগে এমন বিজয় দিবস আগে কখনো আসেনি। তিনি বলেন, সামনে যে নির্বাচন আসছে, আশা করছি জনগণ সেখানে এমন একটি দলকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে যারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে। এসময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, যারা পতিত শক্তি তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার, নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। আমাদেরকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। ভোট প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, এনসিপির প্রার্থী গণভোটের প্রার্থী হয়ে জনগণের কাছে যাবে। সংস্কারের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হবে। ভবিষ্যতমুখী রাজনীতির প্রত্যয়ে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
গণঅধিকার পরিষদ নেতা রাশেদ খান বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, এই গণঅভ্যুত্থানে দুই হাজার ছাত্রজনতা শহীদ হয়েছে আমরা দেখেছি, কিভাবে গণঅভ্যুত্থানের সময় নির্বিচারে গুলী করে শিশু থেকে বৃদ্ধ এবং তরুণদের এমনকি আমাদের মা-বোনদের হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ধরনের অতীতে আর ফিরে যেতে চাই না। আমরা মনে করি, আমাদের সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে হবে।
এদিকে মহান বিজয় দিবস উদযাপনে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহে জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন ও রঙিন নিশান দ্বারা সজ্জিত করা হয়। এদিন বিকেল ৩টা থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিবেশিত হয় বিজয় দিবসের গান। পাশাপাশি সারা দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পরিবেশন করেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় তিন দিনব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন শিশুদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ওপর আবৃত্তি, প্রবন্ধ রচনা এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দিবসটি উদযাপনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে প্রদর্শন করে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে অনুরূপ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে জেলা উপজেলা পর্যায়ে সুবিধাজনক সময়ে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ফুটবল ম্যাচ, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, কাবাডি ও হাডুডু প্রভৃতি খেলার আয়োজন করে। গতকাল বিকেলে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেন। এছাড়া, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দেশের সব হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র এবং শিশু পরিবার ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশে টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি বেতার ও টিভি চ্যানেলে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসভিত্তিক অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। দেশের সকল শিশু পার্ক ও জাদুঘরসমূহে বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় এবং ঢাকাসহ সারা দেশের সিনেমা হলগুলোতে বিনামূল্যে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়।
এ ছাড়া, চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা ও পায়রা বন্দর, ঢাকার সদরঘাট, পাগলা ও বরিশালসহ বিআইডব্লিউটিসি’র ঘাটে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড একক ও যৌথভাবে জাহাজগুলো সকাল ৯টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জনসাধারণের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার মাগফেরাত, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য কামনা এবং দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে সারা দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।