রাজশাহী মহানগরীতে অবৈধভাবে ভরাটকৃত পুকুরগুলো উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি প্রশাসন। জানা যায়, গত ১০ বছরে প্রায় ৮০০ পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পুকুর ছিল ৪৮টি। তবে সরকারি প্রশাসনের উদ্যোগে ভরাট করে ফেলা পুকুরগুলো পুনর্খনন করার কাজ শুরু হয়েছে।

রাজশাহী মহানগরীর পঞ্চবটি আহমদপুর এলাকায় ভরাট করা একটি পুকুর উদ্ধার করেছে প্রশাসন। কয়েক দিন ধরে কৌশলে ধীরগতিতে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে সিংহভাগ অংশ মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলা হলেও সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে পুকুরটি উদ্ধার করা হয়। অভিযান শুরু হলে পুকুর ভরাটের সঙ্গে জড়িতরা ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়েন। এদিকে নগরীর মোল্লাপাড়া মৌজায় ৬৩ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর কয়েকদিন ধরে গোপনে ভরাট চলছিল। ইতোমধ্যে পুকুরটির সিংহভাগ ভরাট করে ফেলা হয়। গত মঙ্গলবার বিকেলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে অভিযানে যান। তার আগেই পুকুর ভরাটের সঙ্গে জড়িতরা পালিয়ে যায়। অভিযানে নিজেই যান রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ। তিনি জানান, সিটি করপোরেশন এলাকায় পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ হলেও যারা এই কাজটি করছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি পুনর্খননের খরচ পুকুরখেকোদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। পুকুরটি আগে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এরপর খননযন্ত্র দিয়ে ভরাট করা মাটি তুলে পুকুরটি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। পুকুর পুনর্খনন না হওয়া পর্যন্ত সেখানে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্বে থাকবেন বলে জানান প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

নগরীর আহম্মদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের আরাজি শিরোইল মৌজায় অবস্থিত পুকুরটি ‘মেহেরের পুকুর’ নামে পরিচিত। ২০২২ সালের মার্চে পুকুরটির অংশবিশেষ নগরীর দুই ব্যক্তি মূল মালিকের কাছ থেকে কিনে নেন। এরপর ২০২৩ সালের ৫ জুন বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয়ে আস্ত পুকুরের শ্রেণি বদলে ভিটা (আবাসিক) করে ফেলা হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে এটি ভরাট করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পুকুর ভরাট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভরাটকৃত পুকুর পুনরায় ফিরিয়ে আনাও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল, পাশের একটি ভবন ভেঙে তার ইট ও খোয়া ব্যবহার করে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জানানো হলে তাঁর নির্দেশে পুনঃখনন কাজ শুরু করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে আবার পুকুরটি ভরাট করা না যায়।

উল্লেখ্য, এক সময় রাজশাহী শহরে অসংখ্য পুকুর ছিল। কিন্তু অল্প কিছু পুকুর ছাড়া সবই ভরাট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপি) পক্ষে একজন আইনজীবী ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। তখন বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয় গণনা করে নগরীতে ৯৫২টি পুকুরের অস্তিত্ব পায়। ২০২২ সালের ৮ আগস্ট হাইকোর্ট এই পুকুরগুলো সংরক্ষণসহ কয়েকটি নির্দেশনা দেন। রাজশাহী শহরে আর কোনো পুকুর যেন ভরাট না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়। পাশাপাশি ভরাট হওয়া পুকুরগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনারও নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। সিটি মেয়র, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। কিন্তু ওই নির্দেশনার পরও শহরে একের পর এক পুকুর ভরাট হয়েছে। একজন পরিবেশ কর্মী জানান, গত এক দশকে প্রায় ৮০০ পুকুর বাস্তবে ভরাট হয়ে যায়। একই সময়ে সরকারি ৪৮টি পুকুরের মধ্যে ১৭টি ভরাট হয়ে যায়। এর মধ্যে সরকারি প্রয়োজনে আটটি এবং ৯ পুকুর অবৈধভাবে ভরাট হয়েছে। বর্তমানে শহরে সরকারি ও ব্যক্তিগত মিলিয়ে ১৫০টি পুকুর অবশিষ্ট আছে।