সিলেট ব্যুরো: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের বিরুদ্ধে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে আরও সোচ্চার ও কার্যকর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সিলেট প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় ‘আন-এডিটেড’ বা অসম্পাদিত ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্যের কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। তাই সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য দিতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। মানুষ যাতে ব্রেকিং নিউজ দেখে মূলধারার পোর্টালে গিয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে, সেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

শনিবার সকালে সিলেট প্রেসক্লাবের আমীনূর রশীদ চৌধুরী মিলনায়তনে ক্লাব সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূরের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক) হুমায়ূন কবীর, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন ও যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি পাশা খন্দকার।

সিলেটে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিলেট প্রেসক্লাবের দৃঢ়তার প্রশংসা করে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) হলগুলোর নামকরণ নিয়ে অনেকটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। হরতাল-বিক্ষোভের কারণে তিনি অনেকটা হতাশও হয়ে পড়েছিলেন। সেই অচলাস্থা নিরসনে সিলেট প্রেসক্লাব অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল। প্রেসক্লাবের তৎকালীন সভাপতি মুকতাবিস উন নূর ও সাধারণ সম্পাদক আহমেদ নূরের নিরলস প্রচেষ্টায়-সেই সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়েছিল। তাদের কারণে কালেক্টরেটে বসেই বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সুরাহা করা সম্ভব হয়েছিল। ‘নিজে অন্তর্মুখী মানুষ হওয়া স্বত্বেও’ মূলত সেই কৃতজ্ঞতাবোধের কারণেই তিনি প্রেসক্লাবের অভিষেকে আসতে সম্মত হয়েছেন। সিলেট প্রেসক্লাব অতীতে যেভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছে ; আগামীতেও সেই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন-সাবেক মন্ত্রিপরিষদ ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব। সাংবাদিকতার মান ও নৈতিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, অন্যান্য খাতের মতো সাংবাদিকতাতেও কিছুটা অধঃপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, পেশাদার সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে উঠবেন। তিনি সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ থেকে দেশ ও জনস্বার্থে কাজ করার পরামর্শ দেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির বলেন, সুস্থ সমাজ গঠনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যম খুবই জরুরি। কিন্তু, বর্তমানে ভুয়া ও অপতথ্যের কারণে মানুষজন নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এসব মোকাবেলায় সিলেট প্রেসক্লাবের মতো সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সিলেট প্রেসক্লাব একটি ঐতিহ্যবাহী প্রেসক্লাব এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রেসক্লাব মজবুত হলে সুস্থ ও স্বাভাবিক সাংবাদিকতা মজবুত থাকবে, উন্নয়নের দাবিও মজবুত হবে। তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের উন্নয়নে সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ উল্লেখ করে বলেন, সাংবাদিকরা সঠিকভাবে কাজ করলে দেশ এগিয়ে যাবে। ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে এজন্য সকলকে সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, অনেক জীবনের বিনিময়ে দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। তাই, নির্বাচনে সঠিক ভাবে নেতৃত¦ নির্বাচন করতে হবে। ‘হ্যা’ ভোট দিয়ে দেশের সংস্কার কাজে সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মোহাম্মদ মহসিন উদ্দিন বলেন, সাংবাদিকরা অনেকক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মীও। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সহায়তার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব সাংবাদিকের নৈতিকতা নেই, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। তবেই, ভালো-মন্দের পার্থক্য নিরূপন করা সম্ভব হবে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি পাশা খন্দকার এনআরবি (নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশী)-দের মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন। বর্তমানে এ দেশের পঞ্চম প্রজন্ম বিলেতে অবস্থান করছে-এই তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের প্রজন্মকে হারাতে বসেছি। এজন্য তাদেরকে দেশমুখী করতে হবে। চায়না যেভাবে তাদের প্রজন্মকে দেশে ফিরিয়ে আনছে-বাংলাদেশেরও অনুরুপ ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য সিলেট প্রেসক্লাবকে ভূমিকা রাখতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে মুকতাবিস উন নূর বলেন, বর্তমানে সাংবাদিকতায় পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিকতার ঘাটতি রয়েছে। পবিত্র আল কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রণ করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।’ সিলেট প্রেসক্লাব এই ধরনের সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে চায়-উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এই পেশাকে সম্মানিত করতে চাই। অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ায় তিনি প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিসহ অন্যদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ইকবাল সিদ্দিকী ও আহমেদ নূর, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্যারিস্টার নজির আহমদ, দৈনিক সিলেট সংলাপ সম্পাদক মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান, দৈনিক সিলেটের ডাক-এর অতিথি সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাসন, দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধাান আব্দুল কাদের তাপাদার ও দৈনিক আমার দেশের সিলেট ব্যুরো প্রধান খালেদ আহমদ।

স্বাগত বক্তব্যে রাখেন অভিষেক কমিটির আহব্বায়কও সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবির। অনষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন ক্লাব সদস্য মুন্সী ইকবাল ও গীতা পাঠ করেন ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সমরেন্দ্র বিশ্বাস সমর। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন-সিলেট প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিকে সিলেট প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে সিলেট প্রেসক্লাব, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন(এসএমইউহজে), বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় পত্রিকা-দৈনিক সিলেটের ডাক, দৈনিক জালালাবাদ, দৈনিক সিলেট মিরর, দৈনিক সিলেট বাণী, দৈনিক কাজিরবাজার, দৈনিক দৈনিক জৈন্তাবার্তা, দৈনিক প্রভাতবেলা ও দৈনিক শুভ প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে প্রধান অতিথিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে প্রধান অতিথি সিলেট প্রেসক্লাবের মকবুল হোসেন চৌধুরী পাঠাগার পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠানে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও মানবসম্পদ) মো: মাসুদ রানাসহ সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্যবৃন্দসহ সুধীজনেরা উপস্থিত ছিলেন।