রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলায় হঠাৎ করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সারাদেশেই শিশুরা এ রোগের আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই রোগের টিকা পাওয়ার পরেও কেন এই সময় আবার রোগটির প্রবণতা বাড়ছে, সেই আলোচনা জোরদার হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের। কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছেন বলেও বলছেন তারা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ছয়শ কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে রোববার জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি অভিযোগ করেছেন, গত আট বছর অতি সংক্রামক এ রোগটির টিকা না দেওয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে।
ওদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা আগামী জুলাই-অগাস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ‘ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দিবে। সবকিছু একত্রিত হলেই আমরা ক্যাম্পেইন (বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি) শুরু করবো,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ও শিশু চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুক দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া হামের জন্য যে টিকা দেওয়া হচ্ছে সেই টিকার মান এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকা দেওয়ার কারণে ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন নতুন করে হামের প্রকোপে ভূমিকা রেখেছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে।
‘সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায় শিশুরা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে যারা আক্রান্ত তাদের ৩৩ ভাগ এই বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সীদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বাড়ছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন শাহরিয়ার সাজ্জাদ।
চট্টগ্রামে হামের উপসর্গে ১২ শিশু
হাসপাতালে
চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১২ জন শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। এসব শিশুকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আলাদা একটি কর্নারে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই কক্সবাজার অঞ্চল থেকে এসেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। তাদের সবার বয়স ১৫ মাসের নিচে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, শিশু ওয়ার্ডে আগে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত কর্নারটি বর্তমানে হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ভর্তি হওয়া শিশুদের সেখানে আলাদা করে রাখা হয়েছে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে দুইজনের বয়স ছয় মাসের কম, আর বাকিদের বয়স সাত থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। ওই কর্নারে অন্য কোনো রোগী রাখা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিঞা জানান, সাধারণত উপসর্গের ভিত্তিতেই প্রাথমিকভাবে হাম শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। তবে পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত হওয়া যায়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে যাদের হামের সন্দেহ করা হয়, পরবর্তীতে তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই রোগটি নিশ্চিত হয়। যদিও হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা কোনো ইউনিট নেই, তবুও রোগীদের পৃথক স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া-এ ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগের ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য গুরুতর সমস্যা হতে পারে। সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
একটি দাতা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরে ১০ জানুয়ারি সেখানে সতর্কতা জারি করা হয়। বাংলাদেশ এখনও সম্পূর্ণভাবে হামমুক্ত না হলেও টিকাদান কর্মসূচির কারণে রোগটির প্রকোপ অনেকটা কমে এসেছিল।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি আবার বাড়ছে। পাশাপাশি দেশে কয়েক বছর ধরে হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি জোরদারভাবে পরিচালিত না হওয়াও একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, এখনো নিশ্চিতভাবে একে হাম বলা যাচ্ছে না। তবে সংক্রমণের আশঙ্কা বিবেচনায় রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।