খুলনা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্যে খুন হলেন হত্যা ও অস্ত্র মামলার আসামী মাসুম বিল্লাহ। গত বুধবার রাত ৯টার দিকে নগরীর ডাকবাংলো মোড়স্থ বাটার দোকানে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয় জনতার সহায়তায় পুলিশ অশোক ঘোষ (৩৮) নামে এক হত্যাকারীকে অস্ত্রসহ আটক করেছে। নিহত মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক এবং রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। নিহত মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের মৃত মিনহাজ উদ্দীন মুন্সী ওরফে মিনা মুন্সির ছেলে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার রাত ৯টার দিকে মাসুম বিল্লাহ তার কন্যাকে নিয়ে ডাকবাংলো মোড়ের বাটার শো রুমে আসেন। সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব থেকে উৎপেতে থাকা দূর্বৃত্তরা তার ওপর গুলী চালায়। ৩টি গুলী বিদ্ধ হয়ে মাসুম বিল্লাহ লুটিয়ে পড়ে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অপরদিকে গুলী করে পালানোর সময় অশোক ঘোষ নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলী উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রাথমিক সূত্রে পুলিশ জানায়, তাৎক্ষণিক অশোক ঘোষ নামে এক সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়। সে নগরীর লবণচরা থানার সাচিবুনিয়া এলাকার বিশ্বনাথ ঘোষ ও সুমিত্রা ঘোষের পুত্র। সে সন্ত্রাসী আশিক গ্রুপের সদস্য। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলী উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে খুলনার শীর্ষ ও আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ বি-কোম্পানী ও আশিক বাহিনীর মধ্যে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্রীক দ্বন্দ্বের জের কাজ করেছে বলে একাধিক সূত্র ধারণা দিয়েছে।

এদিকে, ঈদকে সামনে রেখে প্রকাশ্য দিবালোকে শহরের প্রাণকেন্দ্রে গুলী ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নগরীতে আতংক বিরাজ করছে। ঘটনার পর থেকে বাজার এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং লোকজন চলাচল কমে গেছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীরা বি-কোম্পানীর সদস্য। মাসুমকে গুলী করে পালানোর সময় ট্রাফিকের এক ইন্সপেক্টর তাকে আটক করে। এ সময় জনগণ উত্তেজিত হলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা সদর থানায় নেওয়া হয়েছে।

একাধিক গোয়েন্দা শাখার সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রূপসা টোল প্লাজা ভাংচুর এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে খুলনার লবণচরা এলাকার সন্ত্রাসী আশিক বাহিনীর সঙ্গে মাসুম বিল্লাহর বিরোধ হয়। ওই বিরোধের জেরেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সে মোতাবেক গত কয়েকদিন ধরেই মাসুমের ওপর নজরদারি শুরু করে দুর্বৃত্তরা। তারই অংশ হিসেবে সুযোগ বুঝে তাকে হত্যা করা হয়।

উল্লেখ্য, নিহত মাসুম বিল্লাহ ও তার ভাই গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রূপসার নৈহাটি ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামস্থ জয়পুর এয়ারটেল টাওয়ারের পাশে ইমরান হোসেন মানিক এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর র‌্যাব-৬ রূপসা উপজেলার বাগমারা এলাকা থেকে একটি বিদেশী পিন্ডলসহ মাসুমকে গ্রেফতার করে। এছাড়া ইতোপূর্বে রামপালের ফয়লায় রেনু পোনার বাস ডাকাতি এবং রূপসায় আক্তার হোসেন খান নামে এক ব্যক্তিকে গুলী করে হত্যা চেষ্টার সঙ্গেও মাসুম বিল্লাহর সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইতোপূর্বে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি ভোল পাল্টিয়ে শ্রমিকদলে যোগ দিয়ে নেতা বনে যান। যদিও শ্রমিকদলের ওই কমিটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে স্থগিত করা হয়। এসব নানা অপরাধ কর্মে জড়িত থাকায় তিনি একাধিকবার সংবাদপত্রের শিরোনামও হয়েছেন। এমনকি তার বড়ভাই রূপসার নৈহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শীর্ষ সন্ত্রাসী মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল (৫২) ২০২০ সালের ৩০ জুলাই র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। তিনি ফাটাকেষ্ট নামে পরিচিত ছিলেন।