শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার দক্ষিণ : উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় কক্সবাজারে ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কক্সবাজারে সরকারি এ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী লীড এনজিও ‘সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থা’ (স্কাস), সহযোগী এনজিও ‘সংযোগ বাংলাদেশ’ ও ‘গ্রীণ এনভায়রনমেন্ট’ কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে অন্তত ১২ কোটি টাকা লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়- নানা ছলচাতুরি আর প্রতারণামূলক আশ্বাস দিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে কথিত ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাকদের সাথে কৃত ওয়াদা ও আশ্বাস ভঙ্গ করে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে গুরুত্বর অভিযোগ উঠেছে। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষক শিক্ষিকাদের সামাজিক অবস্থান নিয়েও ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক শিক্ষিকারা। আর এসব অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী ও বেসরকারী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।

জানা যায়- উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কক্সবাজারের সাথে চুক্তি মোতাবেক লীড এনজিও সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস) কক্সবাজার সদরে ৭০টি এবং পৌরসভায় ১০০টি সহ মোট ১৭০টি এবং স্কাসের সহযোগী এনজিও সংযোগ বাংলাদেশ রামুতে ৭০টি এবং অপর সহযোগী এনজিও গ্রীণ এনভায়রনমেন্ট চকরিয়ায় ৭০টি করে সর্বমোট ৩১০টি শিক্ষণ কেন্দ্র করে ঝড়ে পড়া শিশুদের পাঠদানের কথা ছিলো। কিন্তু এনজিওগুলো চুক্তি লঙ্ঘন করে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে গুটি কয়েক স্কুলের কার্যক্রম চালিয়েছে। বাকী সব স্কুল শুধুমাত্র কাগজে পত্রে অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে কোনো কার্যক্রম ছিলো না। এদের মধ্যে ভয়াবহ দুর্নীতি করেছে রামু উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এনজিও সংযোগ বাংলাদেশ। জানা যায়- তারা ৭০টি স্কুলে কার্যক্রম চালানোর কথা বললেও বাস্তবে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে মাত্র ১২টি কেন্দ্রের। চকরিয়া ও কক্সবাজার পৌরসভাতেও প্রায় একই অবস্থা।

সূত্রেপ্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- তিন বছর মেয়াদী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কক্সবাজার জেলাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর প্রকল্প বাস্তবায়নকারী লীড এনজিওকে অর্থ ছাড় দেয় সরকার। সর্বশেষ গত জানুয়ারী,২০২৪ থেকে জুন, ২০২৪ পর্যন্ত এই ৬ মাসের বিল ২কোটি ২১ লাখ টাকা মঞ্জুরি করেছে সরকার। একইভাবে এর আগের সমস্ত বিলও পরিশোধ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এভাবে তিন বছরে নিয়মিত বিল উত্তোলন করে প্রায় ১২ কোটি টাকা মতো আত্মসাত করেছে লীড এনজিও স্কাস ও সহযোগী এনজিও সংযোগ বাংলাদেশ এবং গ্রীণ এনভায়রণমেন্ট।

অনুসন্ধানে জানা যায়- রামু উপজেলার দায়ত্বিপ্রাপ্ত এনজিও ‘সংযোগ বাংলাদেশ’-এর সিইও সাদিয়া নাছরিন ছিলেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের প্রয়াত নেতা রফিক আহমেদ চৌধুরীর মেয়ে। তৎকালীন সময়ে তিনি রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে লীড এনজিও স্কাস এর নিকট থেকে প্রকল্পের এই অংশ ভাগিয়ে নেন। এবং রামু উপজেলায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নানা ভাবে চাপ প্রয়োগ করে কথিত ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সংগ্রহ করে দেখান। একই ভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকেও প্রভাবিত করে প্রতি কেন্দ্রে ৩০ জন করে ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরিপূর্বক ৭০টি শিক্ষণ কেন্দ্রের অনুমোদন নেন। কাগজেপত্রে ৭০টি কেন্দ্র এবং প্রতি কেন্দ্রে ৩০জন করে ২১শ’ ঝরেপড়া শিক্ষার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে রয়েছে ১২টি কেন্দ্রের অস্তিত্ব। এসব কেন্দ্রেও শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কোথাও ১৫জন, কোথাও ২০জন আবার কোথাও ২৫জন। বিষয়টি তদন্তে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন অনিয়মের কথা প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন খোদ রামু উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু নোমান শামীম। একই ভাবে তিনি উক্ত বিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবগত করেন বলে জানান।

সরেজমিন এসব শিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়- শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে উপবৃত্তির টাকা দেওয়ার কথা বলে কাউকেই কোনো মাসে উপবৃত্তির টাকা দেওয়া হয়নি। বছরে ৪ বার করে প্রতি বিষয়ের উপর খাতা দেওয়ার কথা থাকলেও দেয়নি। ঠিক মতো দেওয়া হয়নি বই, খাতা, কলম, ব্যাগ সহ নির্ধারিত অন্যান্য শিক্ষা উপরকরণ। যা দেওয়া হয়েছে তাও অত্যন্ত নিম্নমানের। একই ভাবে শিক্ষকদেরও দেওয়া হয়নি ঠিক মতো বেতন, বোনাস ও শিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য নেওয়া ঘর ভাড়ার টাকা। উল্টো নির্ধারিত বেতন থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে এক বা একাধিক মাসের টাকা। এমনকি ঘরভাড়ার জন্য নির্ধারিত টাকা থেকেও কেটে নেওয়া হয়েছে টাকা। এসব কারণে বাড়িওয়ালার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে বিভিন্ন সময় বাদানুবাদে জড়াতে হয়েছে বলে আক্ষেপ করে জানান একাধিক শিক্ষিকা।

এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলো জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নয়ছয় হিসাব দিয়ে বরাদ্দের বাকী এক বছরের টাকা দ্রুত ছাড় নেওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রথম ৬ মাসের টাকা পাস হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। অথচ চুক্তি ও নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প ব্যয় নিজ থেকে দিয়ে চালিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তীতে বিল পেশ করে বরাদ্দের টাকা ছাড় নেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু অভিযুক্ত এসব এনজিও হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের পরিশ্রমের বেতন ও ঘরভাড়া মাসের পর মাস বকেয়া রেখেছে। এভাবে কারও কারও ১৮ মাস পর্যন্ত বেতন ও ঘরভাড়া বকেয়া রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়- সারাদেশের ঝরেপড়া শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আওতায় আনতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় ২০২০ সালে সেকেন্ড চান্স এডুকেশন (সাব-কম্পোনেন্ট ২.৫’ আউট অব স্কুল চিল্ড্রেন-(ওওএসসি) প্রোগ্রাম, পিইডিপি-৪) কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক জেলা থেকে একটি লিড এনজিও নির্বাচন করা হয়। কক্সবাজারে লিড এনজিও হিসেবে ‘সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থা’ (স্কাস) কক্সবাজার সদর, পৌরসভা, রামু এবং চকরিয়া উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। তবে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতেই সংস্থাটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে কথা হলে প্রকল্পের রামু উপজেলা ম্যানেজার মো. রেজাউল করিম মুঠোফোনে অনিয়ম দুর্নীতির কথা অকপটে স্বীকার করেন। তার দাবি- এধরণের অনিয়ম দুর্নীতি সারাদেশে হয়েছে। এই দুর্নীতির সাথে সরকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জড়িত। তার ভাষ্য মতে- সরকারী কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই এনজিওগুলো দুর্নীতি করতে বাধ্য হয়েছে। নাহলে চুক্তি ও নিয়ম মোতাবেক প্রকল্প চালিয়ে নিতে পারতেন।

অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস) এর নির্বাহী পরিচালক জেসমিন প্রেমার সঙ্গে। তিনিও অনিময় দুর্নীতির কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, জাল-জালিয়াতি বা অনিয়ম-দুর্নীতির এসব চিত্র সারাদেশে একই। এছাড়াও সহযোগী এনজিও সংযোগ বাংলাদেশের অনিয়ম দুর্নীতির ব্যাপারে বলেন- আমি তাদের বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না। তারা আমার কাছ থেকে জোর করে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে উক্ত প্রকল্পের রামু উপজেলায় কাজ নিয়েছে। শুরু থেকেই তারা অনিয়মে জড়িয়েছে।

কক্সবাজার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মাহদী আল হাসান বলেন- আমি কক্সবাজার কার্যালয়ে যোগদান করেছি প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ে। যখন থেকে যোগদান করেছি তখন থেকে সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। তাদের কাজে বেশ কিছু গাফলতি পাওয়া গেছে। এসব ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।