তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়লেও আমদানি বাড়েনি। গেলো বছরের আমদানিকৃত গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় তীব্র সংকটে পড়েছে ভোক্তারা। বিশেষ করে খুলনা মহানগরীসহ পার্শ্ববর্তী জেলা উপজেলার হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। দু’একজন ডিলারের কাছে গ্যাস থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার প্রতি চার থেকে পাঁচশ’ টাকা বেশি দামে। সংকট মোকাবেলায় অনেকে জ¦ালানি কাঠের প্রতি ঝুঁকছে। তবে গ্যাস সংকটের প্রভাবে জ¦ালানির দামও পূর্বের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছর ১০ শতাংশের বেশি হারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ে। তাই বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হয়। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার টন। আগের বছরের তুলনায় গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি কমার হার ছিল বেশি। এতে এলপিজির বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

সূত্র বলছে, ২০২৩ সালে এলপিজি আমদানি হয় ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। আর গত বছর আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। আমদানি বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো ১০ শতাংশ কমেছে। এতে বছর শেষে যেটুকু মজুত থাকার কথা, তা-ও বাজারে বিক্রি করা হয়ে গেছে।

বিইআরসি বলছে, দেশে এলপিজি ব্যাবসার লাইসেন্স নিয়েছে ৫২টি কোম্পানি। এর মধ্যে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরতে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানি করার সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত বছর কোনো না কোনো মাসে আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি। আর প্রতি মাসে আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বছরের শুরুতে আমদানি করলেও শেষ দিকে কেউ কেউ আমদানি বন্ধ রাখে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এদিকে ইরান থেকে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। চীনের মতো বড় ক্রেতারাও এখন বৈশ্বিক এলপিজি বাজার থেকে কিনছে। তাই এলপিজি কেনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৭০টি জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। ডিসেম্বরে আরও ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে সবাই আমদানির চেষ্টা করছেন। কিন্তু জাহাজ ভাড়াসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। সংকট কাটাতে সরকার সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে এলপিজি আমদানি কিছুটা সময় সাপেক্ষ।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের বিষয় খুলনার নিউ মার্কেটের সামনে হোটেল ব্যাবসায়ী মোঃ রফিক বলেন, একে-তো গ্যাস সংকট তার ওপর দাম বৃদ্ধি এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাবসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১২শ’ ৫০ টাকায় কিনেছি। কিন্তু এখন ১৫শ’ ৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

বেসরকারি চাকরিজীবী লাবিবা বেগম বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যাতে করে কেউ হুটহাট বৃদ্ধি করতে না পারে এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”

ওমেরা কোম্পানির ডিলার সিফাত ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী আরাফাত হোসেন বলেন, “আশা করি গ্যাস ব্যবসায়ীসহ সকল পর্যায়ের ভোক্তাদের কথা বিবেচনা করে দাম বৃদ্ধি এবং সংকটের বিষয় সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।”

রূপসার জহিরের বটতলার ব্যবসায়ী আলামিন শেখ বলেন, “আমি অনেক কোম্পানির গ্যাস বিক্রি করি। কিন্তু এখন শুধু ওমেরা কোম্পানির ২-১টা গ্যাস বিক্রি করতে পারছি। বসুন্ধরাসহ অন্যান্য কোম্পানির সাপ্লাই নেই বললেই চলে। আমার প্রতিদিন ১০-১২টা গ্যাস বিক্রি হতো। কিন্তু সংকট থাকায় বিক্রি করতে পারছি না। দ্রুত এর সমাধান না হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসবে।”

লবণচরা এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “গ্যাসের দাম বাড়ায় জ্বালানি কাঠের চাহিদা ও দাম বেড়েছে। মণপ্রতি চম্বল কাঠ ২০০ টাকা ও মেহগনি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। পূর্বের তুলনায় এসব কাঠ মণ প্রতি ১০-২০ টাকা বেড়েছে।

রূপসা জহিরের বটতলা এলাকার জ্বালানি কাঠ ব্যবসায়ী মামুন মোল্লা বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে জ্বালানি কাঠের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম খুব একটা বাড়েনি। প্রতি মণ শুকনো কাঠ ৩৫০ টাকা, আধা শুকনো ২৯০ থেকে ৩১০-২০ টাকা দরে বিক্রি করছি।