হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা উন্নতি-অবনতির দোলাচল চলমান। এভারকেয়ার হাসপাতালে তার চিকিৎসা নিয়ে গঠিত বহুজাতিক মেডিকেল বোর্ড নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে। রাজনৈতিক অঙ্গন, পরিবারের ভেতর ও বাইরে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহীদের আনাগোনা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা আসে ভিড় না করতে, হাসপাতালের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ না করতে এবং চিকিৎসা কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি না করতে। তবুও রোববার এভারকেয়ারের সামনে মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
এদিকে বেগম জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা বলছেন, গত কয়েকদিনের চেয়ে সামান্য উন্নতি হয়েছে। তিনি কথা বলেছেন, তবে এখনো সংকট কাটেনি। তারা বলছেন, গত তিনদিনের চেয়ে রোববার বেগম জিয়ার অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো সামগ্রিক সংকট কাটেনি। ডায়ালাইসিসসহ অন্যান্য ট্রিটমেন্ট অব্যাত রয়েছে। চিকিৎসকরা হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীদের ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
গুরুতর অসুস্থ বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া গত বুধবার থেকে প্রায় সাড়াহীন ছিলেন। তিন দিন পর গত শনিবার থেকে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি কথা বলেছেন। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক এবং খালেদা জিয়ার পরিবার-ঘনিষ্ঠ সূত্র বলেছে, গতকাল সকালের দিকে সিসিইউতে খালেদা জিয়ার শয্যা পাশে থাকা ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানের সঙ্গে তিনি সামান্য কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গত বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবারের চেয়ে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। তবে সামগ্রিক সংকট কাটেনি। বিশেষত কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তাকে টানা চার দিন ডায়ালাইসিস করতে হয়েছে। চিকিৎসকেরা পরিস্থিতিকে এখনো ‘গুরুতর’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, আগামী কয়েকটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি কার্যক্ষমতায় স্থিতিশীলতা ছাড়া তার সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় স্থায়ী উন্নতি আসা কঠিন।এই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যুক্ত দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তার উন্নত চিকিৎসার জন্য আবার বিদেশে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে তার শারীরিক অবস্থা বিমান যাত্রার ধকল সামলানোর জন্য কতটা সক্ষম, তার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্র জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা আগামী এক-দুই দিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা দেখবেন। সম্ভব হলে তাকে আবার লন্ডন ক্লিনিকে নেওয়া হবে, যেখানে তার চিকিৎসা হয়েছিল। সেটি সম্ভব না হলে কম দূরত্বের সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই মুহূর্তে অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার মতো তার শারীরিক অবস্থা নেই।
জানা গেছে, খালেদা জিয়ার কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় তার শরীরে, বিশেষ করে ফুসফুসে মাত্রাতিরিক্ত পানি জমে যায় এবং ভীষণ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে গত বুধবার থেকে তাকে ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে। শরীরের পানি কমানো যাচ্ছিল না। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। সচেতন থাকলেও তিনি সাড়া-শব্দহীন হয়ে পড়েন। কয়েক দিনের ডায়ালাইসিস পরবর্তী শারীরিক অবস্থা দেখে মেডিকেল বোর্ড নতুন চিকিৎসাব্যবস্থা নেবে।
পরিবার-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার সামান্য কথা বলার বিষয়টি চিকিৎসকেরা ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তবে তারা এ-ও বলছেন, এখনো যেকোনো সময় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। গত রোববার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনি এখন হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রয়েছেন। মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা চলছে। গত শুক্রবার রাতে তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা।
এদিকে গতকালও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। তারা বেগম জিয়ার সুস্থতা কামনা করেন।
খালেদা জিয়ার ভ্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেছেন, মেডিকেল বোর্ডের দেয়া চিকিৎসা খালেদা জিয়া গ্রহন করতে পারছেন। তিনি বলেন, শি ইজ ম্যানটেইনিং দি ট্রিটমেন্ট অর্থাৎ চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন এই চিকিৎসা উনি গ্রহণ করতে পারছেন। কাজেই এই চিকিৎসা যাতে উনি গ্রহণ করে সুস্থ হয়ে যেতে পারেন সেই জন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন এটাই আমাদের আহ্বান। বিদেশে নেয়ার বিষয়ে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে সার্বিকভাবে উনার শারীরিক সুস্থতা এবং মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশের ওপর। সেই সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশ পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে গ্রহণ করা হবে। আপনাদেরকে জানানো হবে।
জাহিদ বলেন, গত ২৭ তারিখ থেকে বিএনপি চেয়ারপার্সনকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে(সিসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ম্যাডামের চিকিৎসা কার্যক্রম সার্বক্ষণিকভাবে তদারক করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং উনি সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসকদের সাথে, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের সাথে সমন্বয় করে চিকিৎসা কার্যক্রম যাতে কোন অবস্থাতেই ব্যহত না হয় সেই লক্ষ্যে উনি সার্বিক সহযোগিতা এবং দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ম্যাডামের চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা ইউকে এবং কিংডম অফ সৌদি অ্যারাবিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্রের জন হোপকিংস এবং মাউন্ট সিনাইসহ বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের যৌথ আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই ম্যাডামের চিকিৎসা এখানে অব্যাহত আছে এবং চিকিৎসা অব্যাহত থাকবে। অধ্যাপক জাহিদ বলেন, আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে এবং সকল মানুষের কাছে উনার সুস্থতার জন্য আমরা দোয়া চাই।
এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার ভিড় না করার অনুরোধ সত্ত্বেও এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে জড়ো হচ্ছেন খালেদা জিয়ার সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। নেত্রীকে একনজর দেখার সুযোগ না থাকলেও স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন তারা। নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অসুস্থতার খবর ঘিরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং প্রার্থনাই এখন ‘খালেদা প্রেমীদের’ প্রধান ভরসা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের ঠিক সামনেই কঠোর সতর্কতায় অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশেই লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে আছে টেলিভিশন সাংবাদিকদের ক্যামেরা স্ট্যান্ড। ফুটপাত আর সড়কের একাংশজুড়ে অবস্থান নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দলটির কর্মী-সমর্থকরা, যাদের কেউই সরাসরি হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারেন না, কিন্তু তারা মনে করছেন, এই কাছাকাছি অবস্থানটুকু যেন দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে করা একটি নীরব উপস্থিতি। এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনের অংশেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি। পৃথক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়। খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় রোববার বিকেল ৫টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছে বলেও পূজা উদ্যাপন পরিষদের বিবৃতিতে জানানো হয়।হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় স্বার্থে খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করি আমরা।