নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ফিশিং ট্রলার ও বোট মালিকরা। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা-বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে ঘিরে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাতেও। এর ফলে ভরা মৌসুম চললেও অনেক ট্রলার ও বোট সাগরে যেতে পারছে না, আর যারা যাচ্ছে তারাও পূর্ণ সময় মাছ আহরণ করতে পারছে না।

ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়াম থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়াই এ সংকটের মূল কারণ। ফলে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ফিসারি ঘাটগুলোতে মাছ ধরার মৌসুমেও অসংখ্য ট্রলার অলস পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এতে শুধু মালিকরাই নন, সংশ্লিষ্ট হাজারো জেলে, মাঝি ও শ্রমিকও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

ঘাটে সরেজমিনে দেখা যায়, যেখানে মৌসুমের সময় ট্রলারগুলোর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন অনেক নৌযান জ্বালানির অভাবে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক জেলে দিন কাটাচ্ছেন কাজের অপেক্ষায়। জ্বালানি সংকটের কারণে একদিকে ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না, অন্যদিকে যারা যাচ্ছে তারাও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

সাধারণত ভরা মৌসুমে একটি ট্রলার টানা ২০ থেকে ২৪ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে মাছ আহরণ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে এ সময় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনে। ফলে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে অনেক মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

ফিসারি ঘাটের একাধিক মাঝি ও শ্রমিক জানান, গত বছর এ সময়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঘাটে বসে আছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে।

ট্রলার মালিকদের তথ্যমতে, একটি ছোট ট্রলারের জন্য গড়ে ১,০০০ থেকে ২,০০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। আর বড় বাণিজ্যিক ট্রলারের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ লিটার পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি-সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে কিনতে হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে সামনে আসছে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছরের মতো আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। এছাড়া অক্টোবর মাসে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে আরও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৪০ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে বছরের বাকি সীমিত সময়ের ওপরই নির্ভর করে তাদের। এই সীমিত সময়েও যদি জ্বালানি সংকটের কারণে মাছ ধরা ব্যাহত হয়, তাহলে তাদের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, “জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সামনে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার সময়-এই দুই চাপ একসঙ্গে সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।” তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর চট্টগ্রামের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. জহিরুল হক বলেন, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক বাণিজ্যিক ট্রলার আগেভাগেই ফিরে আসছে। আবার কিছু ট্রলার মালিক অতিরিক্ত দামে কালোবাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। ফলে কেউ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সমুদ্রে থাকতে পারলেও, অনেকেই মাঝপথেই মাছ ধরা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএফএ) মহাসচিব এবং ব্লু হারবার ফিশিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজালাল বলেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়াম থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। শুরুতে সংকট আরও তীব্র ছিল। অনেক ট্রলার মালিক বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনেছেন।” তিনি জানান, এতে কিছু ট্রলার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত মাছ ধরতে পারলেও অধিকাংশ ট্রলারই জ্বালানি সংকটের কারণে মাঝপথে ফিরে আসছে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামনে দীর্ঘমেয়াদি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা-এই তিনটি বড় চাপে পড়ে কর্ণফুলীর জেলে, বোট ও বাণিজ্যিক ট্রলার মালিকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।