নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো :

ফয়’স লেককে ঘিরে অবৈধ বসতি, চুক্তিভঙ্গ ও পরিবেশ ধ্বংসের ফলে চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম প্রধান সুপেয় পানির উৎস আজ চরম হুমকির মুখে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে-বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পর্যটন কর্পোরেশনের সঙ্গে করা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমে ফয়’স লেকের সংরক্ষিত জলাধার, পাহাড়ি ছড়া ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে প্রায় ১৫ লাখ নগরবাসী ও রেলওয়ের যাত্রীদের পানীয় জলের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ইতিহাস ও পানির উৎস : ১৮৯২ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে চট্টগ্রামে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগর পানি সরবরাহের সূচনা হয়। ১৯১০ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী মিস্টার ফয়’স এর পরিকল্পনায় ফয়’স লেক এলাকায় প্রায় ২ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি ছড়া ঘিরে জলাধার নির্মাণ করা হয়। এই জলাধারের বার্ষিক ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ২৭০ কোটি লিটার এবং দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ছিল ৩০ লাখ লিটার। দীর্ঘদিন ধরে এই পানি পরিশোধন করে রেলওয়ের কলোনি, পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ এবং নগরবাসীর এক বড় অংশকে সরবরাহ করা হতো।

চুক্তি ও শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ : ২০০৪-০৫ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পর্যটন কর্পোরেশনের মাধ্যমে ফয়’স লেক এলাকাকে কেন্দ্র করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিজ চুক্তি হয়। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল-

ফয়’স লেক ও আশপাশের পরিবেশ ও ভূপ্রাকৃতিক গঠন অপরিবর্তিত রাখতে হবে।

পাহাড় কাটা, মাটি ভরাট, গাছ নিধন ও পানিদূষণ করা যাবে না।

লেকের পানি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ; কেবল নিরাপত্তার জন্য সীমিত নৌযান ব্যবহার করা যাবে।

কিন্তু বাস্তবে এসব শর্ত মানা হয়নি বলে অভিযোগ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, লেকের ক্যাচমেন্ট এলাকায় অবৈধভাবে ‘জিয়া নগর-মধ্যনগর-বিজয় নগর’ নামে বিস্তৃত জনবসতি গড়ে উঠেছে। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, কাঁচা-পাকা ল্যাট্রিন, গবাদিপশুর খামার ও কসাইখানা স্থাপন করা হয়েছে।

পরিবেশ ও পানির মানের অবনতি : এই অবৈধ বসতি ও পর্যটন কার্যক্রমের ফলে- মানুষের মলমূত্র, গরুর গোবর ও বর্জ্য পাহাড়ি ছড়া বেয়ে সরাসরি লেকের পানিতে মিশছে। গাছ নিধনের কারণে পাহাড়ি মাটি ক্ষয় হয়ে লেকের তলদেশে জমছে, বাড়ছে পানির ঘোলাভাব।

তেলচালিত নৌযান থেকে নিঃসৃত তেল লেকের পানিতে ভেসে থাকছে, যা জলজ প্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করছে।

২০০৯-১০ সালে রেলওয়ে ও চট্টগ্রাম ওয়াসার যৌথ তদন্তে পানির স্বাভাবিক মাত্রার নিচে (৩.৬–৩.৭) নেমে যাওয়ার প্রমাণ মেলে, যা পানির জৈবিক মৃত্যু ও বিষাক্ততার ইঙ্গিত দেয়। ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল-দূষণ বন্ধ না হলে আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ পানিবাহিত রোগ মহামারির রূপ নিতে পারে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রহস্যজনক ভূমিকায় সেই প্রতিবেদন কার্যকর হয়নি।

ভাল্ব ও ফিল্টার বেডের সংকট : ফয়েজ লেক থেকে ফিল্টার বেডে পানি সরবরাহের জন্য স্থাপিত চারটি বড় ভাল্বের মধ্যে ইতোমধ্যে তিনটি বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট একটি ভাল্বও নষ্ট হলে রেলওয়ের ওয়ার্কশপ, কলোনি এবং পাহাড়তলী-আমবাগান এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী পানির মারাত্মক সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা : চুয়েটের অধ্যাপক ড. রিয়াজ আক্তার মল্লিক দীর্ঘদিন গবেষণা করে পাহাড়ি ছড়া ও ফয়’স লেক রক্ষায় অবৈধ বসতি উচ্ছেদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সুপারিশ করে রেলের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রশ্নের মুখে প্রশাসন :এই ধ্বংসযজ্ঞে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে,-সে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। রেলওয়ে, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও প্রশাসনের সমন্বিত ব্যর্থতায় একটি মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিস্ময় আজ অস্তিত্ব সংকটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফয়’স লেক শুধু তার সৌন্দর্যই নয়, চট্টগ্রামের সুপেয় পানির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবেও চিরতরে হারিয়ে যাবে।