নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো: রাজনৈতিক বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের জন্য ৩৪টি বাণিজ্যিক মৎস্য জাহাজের লাইসেন্স দিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে দেওয়া এই লাইসেন্সগুলো দলীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে যায়। জানা গেছে, এসব জাহাজের মালিকদের মধ্যে রয়েছেন শেখ হাসিনার আত্মীয়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র এবং মন্ত্রীর স্ত্রী।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো বোন নাসরিন খান এবং তার স্বামী নুরুল কাউয়ুম খান পান এফভি কিউ এন-২ ও এফভি কিউ এন-১ নামে দুটি মৎস্য জাহাজের লাইসেন্স। সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হাছান মাহমুদ-এর স্ত্রী নুরান ফাতেমার নামে দেওয়া হয় এফভি জেএসএস ফিশার-এর লাইসেন্স।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মীর্জা আজমের নামে এফভি স্বর্ণালী অপি এবং সংসদ সদস্য আসলামুল হক-এর নামে এফভি সিএম লাবিবা-২-এর লাইসেন্স দেওয়া হয়। বরিশালের নেতা আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ পান এফভি নাজ মঈন-১-এর লাইসেন্স।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিনের ছোটভাই হেলাল উদ্দিন চৌধুরীর নামে এফভি ইউরোষ্টার-১। চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আজম নাছিরের ব্যবসায়িক অংশিদার আহমদ হোসেন এফভি এমিউস নওশিন এবং বাঁশখালীর ইয়াছিন চৌধুরী পান এফভি এফএমসি ঐশী- এর লাইসেন্স।
জাতীয় পার্টি নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহীমের পরিবারের সদস্য রাশেদ মুরাদ ইব্রাহীম, হামিদা দোজা, এসএম ফারুক , আরিফ মোতাহার, মনতাজ উদ্দিন আহমেদ নামে ৫টি মৎস্য জাহাজের লাইসেন্স দেওয়া হয় (এফভি ক্রিসেন্ট-৪, এফভি ক্রিস্টাল-০৭, এফভি ক্রিস্টাল-৮, এফভি ক্রিস্টাল-৯, এফভি ক্রিস্টাল-১০)।
চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা বাবুল সরকার ও চিড়রি জাকির (এফ ভি জম জম-১), হাটহাজারীর ফরিদুল হক (এফভি এলায়েন্স-১), রাউজানের আওয়ামীলীগ নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম খান ও তার স্ত্রী মিসেস মনোয়ারা বেগম (এফভি জে কে-১, জে কে-২), আনোয়ার শওকত আফসার (এফভি পারটেক্স-১) এবং মো. শাহাদাত হোসেন চৌধুরীর নামে দেওয়া হয়েছে মৎস্য জাহাজের লাইসেন্স।
ঢাকার মো. শহিদুল ইসলাম শাহেদ (এফভি রেডিয়েন্স-১) এবং কামরুন নাহার ইসলাম (এফভি সীমান্ত-১)। একই কোম্পানির নামে দিয়েছে দুটি মৎস্য জাহাজের লাইসেন্স। নেত্রকোনাার খন্দকার মশিউজ্জামান (এফভি পিপলস-১) ও মানু মজুমদার (এফভি পিপলস-২), খুলনার শেখ সালাউদ্দিন (এফভি ফারজান) ও কাজী শাহ নেওয়াজ (এফভি এলায়েন্স-২), রাজশাহীর মোতাজ্জেরুল ইসলাম (এফভি সী পাওয়ার-৪), নোয়াখালীর ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ এনায়েতুছ সোবহান (এফ ভি ব্লু নর্থ -১), ময়মনসিংহের স্বপন চন্দ্র দত্ত (এফভি সিএমএল লাবিবা), এবং মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল (এফভি এলায়েন্স-২)। এছাড়া, ঢাকার শফিকুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের মো.মুসা, ও ঢাকার শেখ জালাল উদ্দিনের নামেও একটি করে জাহাজের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
সরকার দলীয় প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাতেই সমুদ্রসম্পদ শোষণের সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে সাধারণ মৎস্যজীবী ও ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ীরা চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে মৎসের প্রকৃত মজুদ নির্ধারণ না করেই বাণিজ্যিক ট্রলারের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছিল। এর ফলে মাত্র তিন বছরে সমুদ্রে মৎস্য ধরার পরিমাণ ২১ শতাংশ কমে গেছে এবং ইলিশ আহরণ প্রায় ৭৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
গভীর সমুদ্রগামী এসব মৎস্য জাহাজ সমুদ্রে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করছে। সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের নিয়ম-কানুন অমান্য করে জাহাজগুলো যেনতেনভাবে মৎস্য আহরণ করছে। যদিও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার, বাস্তবে এসব বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ২৭ মিটার এলাকায়।
একই সীমিত এলাকায় বারবার মাছ ধরার ফলে এবং অগভীর পানিতে জাল ফেলার কারণে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন আহরণ অব্যাহত থাকলে দেশের সামুদ্রিক মাছের সম্পদ টেকসই থাকার ঝুঁকিতে পড়বে।
আইন অনুযায়ী ৪০ মিটারের কম গভীর পানিতে ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের ঘনঘন লঙ্ঘন হচ্ছে। এসব জাহাজ সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে মৎসের ঝাঁক শনাক্ত করছে এবং নিষিদ্ধ সূক্ষ্ম জাল ফেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ পর্যন্ত ধরে ফেলছে।
কম দামি বা বাজারে বিক্রি অনুপযুক্ত মাছ জালে ধরা পড়লে সেগুলো আবার সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর দামি প্রজাতির মাছ ধরার জন্য পুনরায় জাল ফেলা হয়। এতে একদিকে সমুদ্রের পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক মৎসের মজুদ এবং জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অবাধ শোষণ চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
মৎস্য আহরণে ব্যাপক অনিয়ম হলেও সমুদ্রে এর তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। মৎস্য ধরার অনুমতি দেওয়া এবং জাহাজগুলোর জমা দেওয়া কাগুজে প্রতিবেদন যাচাইয়ের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের। বাস্তবে সমুদ্রে গিয়ে নজরদারি বা আইন প্রয়োগের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বলেই সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন।
সরকারি পরিসংখ্যান দেখায়-২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিকভাবে ধরা ইলিশ ছিল ৮ হাজার ১৩৮ টন। কিন্তু আলোচ্য অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৯০ টনে, যা ভয়াবহ পতনের ইঙ্গিত দেয়।
একইভাবে বাণিজ্যিক ট্রলারে ধরা সব ধরনের মাছের পরিমাণ ২০২২-২৩ অর্থবছরের রেকর্ড ১ লাখ ৪৬ হাজার টন থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার টনে, যা ২১ শতাংশ হ্রাস।
ইলিশের মতোই সার্ডিন জাতীয় মাছের সরবরাহও দ্রুত কমছে। গত তিন বছরে এই শ্রেণির মাছ ৫০ হাজার ৭৮৩ টন থেকে ৪৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৬৪ টনে।
অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে সামুদ্রিক চিংড়ির উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে-১ হাজার ৯৫৪ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩ হাজার ২২ টন। তবে ক্যাটফিশের পরিমাণ ৫ হাজার ৬৪৬ টন থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫২৪ টনে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়-পামফ্রেট ধরা পড়েছে ৯৩৬ টন, লাক্ষা (ক্রোকার) ২ হাজার ৬৪৪ টন, কাটলফিশ ১২ হাজার ৬৬ টন, রিবনফিশ ৪ হাজার ৬৩৫ টন, জিউফিশ ৪ হাজার ১২০ টন, ইল মাছ ৫ হাজার ১৯ টন।
এদিকে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্েযর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। আগে বাণিজ্যিকভাবে আহরিত মাছের প্রজাতি ছিল ১১২টির বেশি, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৫-৫৭টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি গভীর সমুদ্রে দ্রুত কমে আসা জীববৈচিত্র্েযর বড় সতর্ক সংকেত।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও পতনের একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সমুদ্রে ধরা পড়ে ১ লাখ ৭ হাজার ২৩৬ টন মাছ। পরের বছরগুলোতে তা বাড়তে বাড়তে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টনে পৌঁছায়। তবে এরপর থেকেই মজুদ দ্রুত কমতে থাকেÑ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টনে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত ট্রলার চলাচল, নিষিদ্ধ এলাকায় ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ ধরা এবং সমুদ্রে কার্যকর নজরদারির অভাব এ সংকটের মূল কারণ। টেকসই ব্যবস্থাপনা না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় মৎস্যের প্রাকৃতিক মজুদ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে মৎস্য শূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, সুষম ও টেকসই মৎস্য আহরণের সক্ষমতা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ম্যাক্সিমাম সাস্টেনেবল ইল্ড (এমএসওয়াই) জরিপ-বাংলাদেশ এখনো তা পরিচালনা করতে পারেনি।
ফলে কতটুকু মৎস্য নিরাপদে ধরা যেতে পারে, কোন প্রজাতির ওপর কতটা চাপ পড়ছে, আর কোন এলাকায় সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি-এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের হাতে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। এ অবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ট্রলিং ও একই এলাকায় বারবার মৎস্য আহরণের কারণে দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ দ্রুত ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক মঈন উদ্দিন জানান, ১৯৮৩ সালের পর আরও বেশ কয়েক দফা সমুদ্র জরিপ হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক মৎস্যজাহাজগুলোকে লাইসেন্স দেওয়ার সময় সমুদ্রে মোট মৎস্যসম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। সরকারের সিদ্ধান্তে এসব মৎস্য জাহাজের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. আব্দুস ছাত্তার জানান, সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর বিধান অনুযায়ী সরকার ফিশিং লাইসেন্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন আহ্বান করা হয়। পরে গঠিত কমিটি যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে চূড়ান্তভাবে ফিশিং লাইসেন্স অনুমোদন করে।