আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: অস্তিত্ব সংকটে সাতক্ষীরার বাগাদি সম্প্রদায়। সরকারের কাছে কোন তথ্য না থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানসহ নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, পরিচয় সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে তাদের উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। জেলার ছয়ঘরিয়া, পারুলিয়া, কুলিয়া, ভাদছড়া, গাজীপুর, ঘোনা, কাথন্ডা, খলিলনগর, বৈকারি, কুশখালী, হিজলদি ও চন্দনপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এ সম্প্রদায়ের বসবাস। পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় তাদের বসতি রয়েছে। জেলাতে প্রায় ১০হাজার বাগাদি সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস। জাতিগত ভাবে তারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’র তালিকায় ৫০টির বেশি গোষ্ঠীর নাম বাগাদিদের চৌদালীদের নাম নেই। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির (ভাতা/সাহায্য) কোনো সুফল তারা পায় না। জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাদের কাছেও এদের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বাগাদিদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী বাগাদিদের আদি পরিচয় স্পষ্ট নয়। প্রচলিত আছে-তাদের পূর্বপুরুষ মাথায় ডালা নিয়ে মাছ বিক্রি করত। ধর্মীয়ভাবে মুসলিম হলেও একসময় তাদের ‘বাগদি’ বলা হতো। দীর্ঘদিন মাছধরাই ছিল প্রধান পেশা; কিন্তু জলাধার সংকটে অনেকেই এখন কৃষিকাজ ও ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করছে। শিক্ষার হার খুবই কম; প্রাথমিকের গন্ডি পেরোনো শিক্ষার্থীও হাতে গোনা। শিশু বয়স থেকেই অনেকে মাছ ধরা বা কাগজ কুড়ানোর কাজে জড়িয়ে পড়ে। দারিদ্র্য এত গভীর যে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার মাটির ঘরে থাকে; অধিকাংশের ছাউনি নারকেলের পাতা। সামান্য বসতভিটাই একমাত্র সম্পদ। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়লে এ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, “তাদের একটি পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয় আছে; কিš‘ রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় স্বীকৃতি না থাকায় তারা উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে পড়ছে।

বাগাদিদের চৌদালীও বলা হয়। সাতক্ষীরা সীমান্তের বেড়িবাঁধের ওপর বসে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব আহমদ আলী চৌদালী। দৃষ্টি কাঁটাতারের ওপারে ভারতের দিকে, কিন্তু তার আক্ষেপ নিজের দেশের সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে। এই পাশের সীমানাটাই যেন তার কাছে আরও কঠিন-এক অদৃশ্য সামাজিক দেয়াল, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু প্রতিটি আচরণে টের পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামের নাম বলদিঘাটা, মানুষ ব্যঙ্গ করে বলে ‘বলদঘাটা’। কাজ চাইতে গেলে বলে-তোরা আলাদা জাত। আমরা মুসলমান, কিন্তু সমাজ আমাদের আলাদা করে রেখেছে। আমরা না বুঝি উপজাতি, না বুঝি কোনো তালিকা; শুধু টিকে থাকাই আমাদের ধর্ম। বৈকারীর সাহেব আলী (৬২) বলেন, পরিচয় পেল আমাদের সঙ্গে মেশে না। কামার, কুমার, মুচি, কায়পুত্র, হরিজন সবাই তো কোনো না কোনো তালিকায় থাকে। আমরা তালিকার বাইরের মানুষ। আমাদের তালিকার প্রয়োজন নেই। আমরা মুসলমান আমরা অধিকার চাই। বাঁচতে চাই।

সাতক্ষীরা জেলার বৈকারী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা সালমা বেগম বঞ্চনাময় জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, “আমাদের জন্ম এই মাটির ঘরে, আর মৃত্যুও এখানে। অন্য মানুষরা আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না, তাই কোথাও কাজও জোটে না। পুরুষদের পাশাপাশি আমাদেরও কাজ করতে হয়, নইলে সংসার চলে না। তিনি জানান, সামাজিক বৈষম্য ও চরম দারিদ্র্যের কারণে এখানকার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। গায়ের রং এবং তাঁদের ‘নিচু’ পেশার দোহাই দিয়ে অন্য গোষ্ঠী থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে না, ফলে বিবাহ সম্পর্ক কেবল তাঁদের নিজেদের জনগোষ্ঠীর (যেমন বৈকারী, ঘোনা) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমানে তাঁদের চিরায়ত মাছ ধরার পেশাটি সংকটে পড়ায় জীবন ধারণ কঠিন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মানুষ আগে যেমন মাছ ধরে বেঁচে থাকত, এখন আর পারে না। অনেকে কাজের সন্ধানে ভারতে চলে গেছে, আর যারা এখানে থাকে, তাদের বেশিরভাগই এখন ইটভাটায় কাজ করতে যায়।

বৈকারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু মো. মোস্তফা কামাল জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজার চৌদালী বসবাস করে, যাদের অধিকাংশ জেলে কার্ড পেলেও কোনো বরাদ্দ পায় না। সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সায়েদুর রহমান মৃধা জানান, জেলার অসহায়, দলিত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তা ও ভাতা আছে। কিন্তু চৌদালীদের কোনো তালিকা তাদের কাছে নেই। তবে আগামীতে তাদের প্রান্তিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়ে পরিকল্পনার আশ্বাস দেন তিনি।