এফ এ আলমগীর চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতাঃ চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদহ বাজারে নির্বাচন পরবর্তী ঘটনার রেশ ধরে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের হামলায় নিহত বড় ভাই জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমানের পর আইসিইউতে থাকা ছোট ভাই জামায়াতের বাঁকা ইউনিয়ন আমীর হাফেজ মাওলানা মফিজুর রহমানেরও (৩২) মৃত্যুতে বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা পাথর বুকে নিয়ে গতকাল তাদের প্রিয় নেতার জানাযা শেষে তাকে দাফন করেছেন। গতকাল বুধবার বেলা ৩টায় নিজ গ্রাম সুটিয়া ঈদগাহ মাঠে জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে বড় ভাই হাফিজুর রহমানের পাশে দাফন করা হয়। এর আগের রাত সাড়ে ১১টায় লাশবাহী গাড়ী ঢাকা থেকে নিজ গ্রামে পৌঁছায়। সেখানে তার ২ শিশু কণ্যার আব্বা আব্বা চিৎকার ধ্বনিতে উপস্থিত মানুষ হতবিহব্বল হয়ে পড়ে। অবুঝ শিশু ২টির সান্ত¡না দেবার ভাষা যেন সবাই হারিয়ে ফেলে। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে নেয়া হয়। ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে তার লাশ আবার গ্রামের বাড়ি পৌঁছে। দুপুরের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে হাজার হাজার বিক্ষুদ্ধ জনতা জানাজায় অংশ গ্রহণ করেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ও দামুড়হুদা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আজিজুর রহমান মফিজুর রহমানের জানাযার নামায পড়ান। জানাযায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, জেলা প্রশিক্ষণ স¤পাদক জিয়াউল হক, জীবননগর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা সাজেদুর রহমান, নায়েবে আমীর হাফেজ বিল্লাল হোসেন ও সাখাওয়াত হোসেন, সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি আবু বক্কর সিদ্দিক, চুয়াডাঙ্গা জেলা মাজলিসুল মুফাসসিরিন পরিষদের সভাপতি মাওলানা হাফিজুর রহমান, জীবননগর পৌর আমীর ফিরোজ হোসেন, সেক্রেটারি ইব্রাহিম খলিল, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, প্রিন্সিপাল আখতারুজ্জামান প্রমুখ। আগের দিন মঙ্গলবার বেলা ১২টায় চিকিৎসাধীন ঢাকাস্থ কাকরাইলের অরোরা স্পেশালাইজড হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান হাফেজ মাওলানা মফিজুর রহমান।
উল্লেখ্য, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব শত্রুতার জের ধরে উপজেলার হাসাদাহ বাজারের স্বেচ্ছাসেবকদলের নেতা মেহেদী হাসান পাশর্^বর্তী সুটিয়া গ্রামে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে যান। বিষয়টি স্থানীয়রা টের পেয়ে তাকে সুটিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে আটকে রেখে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ নিয়ে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সুটিয়া গ্রামের খাইরুল হাসাদাহবাজারে বাজার করতে গেলে মেহেদী হাসানসহ তার দলবল খাইরুলকে মারধর করে। ইফতারের পরে খাইরুলসহ জামায়াত নেতারা বিষয়টি সমাধানের জন্য গেলে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রুপ নেয়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত হাসাদাহ কামিল মাদরাসা গেটের সামনে দফায় দফায় এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় ইউনিয়ন আমীর মাওলানা মফিজুর রহমান আক্রান্ত হলে তাকে উদ্ধার করতে বড় ভাই হাফিজুর রহমান এগিয়ে গেলে বিএনপি সমর্থকরা তাকেও দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের উদ্ধার করে জীবননগর হাসপাতালে পাঠায়। অবস্থার অবনতি হলে হাফিজুর ও মফিজুরকে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়া হয়। রাতেই ঢাকার কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আড়াইটার দিকে মারা যান হাফিজুর রহমান। সংঘর্ষে গুরুতর আহত তার ছোট ভাই ও বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মফিজুর রহমানকে ঢাকার কাকরাইলে অরোরা স্পেশালাইজড্ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়, ১০ দিন পর সেখানেই তিনি সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে মারা যান।
এ ঘটনায় নিহত হাফিজুর রহমানের ভাই বাদী হয়ে জীবননগর থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৮ থেকে ৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর জীবননগর থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট যৌথ অভিযানে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মেহেদী হাসান, তার বাবা বিএনপির কর্মী জসিম উদ্দিন এবং হাসাদহ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ স¤পাদক মো. আবদুস সালামকে গ্রেপ্তার করে।
জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ বলেন, তার বড় ভাইয়ের হত্যা মামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে এই ঘটনায় উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে জীবননগরে। মঙ্গলবার খবর ছড়িয়ে পড়লে বাদ আসর জামায়াতে ইসলামীর জীবননগর কার্যালয় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বাসস্ট্যান্ড ট্রাফিক আইল্যান্ডে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে টায়ার পুড়িয়ে কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে, এ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে।
সমাবেশে বক্তারা নিহত হাফিজুর ও মফিজুর রহমানের হত্যাকান্ড জড়িত বিএনপি কর্মীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবী জানানো হয়।