শাহজাহান (তাড়াশ) সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের সংসদীয় আসনের প্রতিটিতেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, নির্বাচনী প্রচারণার গতি-প্রকৃতি এবং সাংগঠনিক শক্তি বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে প্রচারণা, সংগঠন ও জনসংযোগ-তিন ক্ষেত্রেই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিপরীতে বিএনপি ভুগছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মনোনয়ন অসন্তোষ, বিদ্রোহী প্রার্থী ও সংগঠনের দুর্বল সমন্বয়ের সমস্যায়। সিরাজগঞ্জের গ্রাম, শহর, শিল্পাঞ্চল সব জায়গায় এখন একটি কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে: ‘ জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক, দাঁড়িপাল্লাকে দেখতে চাই কেমন করে!’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি এখনও দলীয় ক্ষোভ সামাল দিতে ব্যস্ত।

সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে একটি সিরাজগঞ্জ-৩। এটি তাড়াশ রায়গঞ্জ ও সলঙ্গা নিয়ে গঠিত। এই আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী শায়খ ড. প্রফেসর আব্দুস সামাদ প্রার্থী ঘোষনার পর থেকেই নির্বাচণী প্রচারণা জোরে শোরে চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী ভিপি আয়নুল হকের নাম প্রাথমিকভাবে ঘোষনা করলেও অভন্তরীন কোন্দলে প্রচার প্রচারনা খুব একটা নেই বললেই চলে। এ আসনে একটানা চারবার বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিল,আ”লীগ ও ছিল বেশ কয়েকবার কিন্ত জনগনের ভাগ্যের কোন উন্নতি হয় নাই। তাই এ আসনটিকে জনগণ আর কাউকে কে দেখতে চায় না। সব জায়গায় জামায়াতের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে বলে অনেকে জানিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির লড়াই হবে।

এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৬। ২ লাখ ২০ হাজার ৭৮৯ পুরুষ, ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৭০ নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের রয়েছেন ৭ জন। বর্তমানে এ আসনটিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দে বেসামাল বিএনপি। এ আসন থেকে বিএনপির ১৭ জন নেতাকর্মী বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি বিএনপির অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী। সে জন্য মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে তারা বিভিন্নভাবে আন্দোলন করছেন। বিএনপির সমৃদ্ধ ভোটব্যাংক থাকলেও ঐক্যের ঘাটতি কাল হতে পারে দলটির। তবে এ আসনে বিগত দিনের তুলনায় জামায়াতে ইসলামীর ভোট ও জনপ্রিয়তা দুটোই বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে প্র¯‘তি নিচ্ছে জামায়াত।

তাড়াশ উপজেলার বাসিন্দা সাজু বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমরা ভোট দিতে পারিনি। ভোট দিতে কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমার ভোট হয়ে গেছে। আবার শুনছি ২০২৬ সালের ফেব্রয়ারির ১২ তারিখ ভোট হবে, তাড়াশে উৎসব মুখর পরিবেশ ও আমেজ শুরু হয়েছে। ভোট দেওয়ার জন্য গ্রামে গঞ্জে ভোটাররা উদ্গ্রীব হয়ে আছে। যদি নির্বাচন কমিশন ভোটকেন্দ্রগুলোতে সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অবশ্যই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেব।’

রায়গঞ্জ উপজেলার ভোটার সুমন বলেন, ‘ আমরা সবদল দেখেছি দাঁড়িপাল্লা দেখিনাই এবার আমরা জামায়াত কেই ভোট দিব। ভোট দেওয়ার পরিবেশ পেলে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে অবশ্যই যাব। যদি দেখি সবকিছু এলোমেলো, ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নেই, তাহলে ঝুঁকি নিয়ে আর ভোটকেন্দ্রে যাব না।’

রায়গঞ্জ উপজেলার আরেক ভোটার খোরশেদ আলম,বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, ভোটের পরিবেশ ও ভোটারদের জীবনমান রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ভোটের দিন প্রতিটি ভোটকেন্দ্রগুলোকে সিসি ক্যামেরার মধ্যে আনতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়োজিত রাখতে হবে। দরকার হলে সেনাবাহিনীকে কিছু ক্ষমতা দিতে হবে। সৎ যোগ্য প্রিসাইডিং অফিসার দ্বারা ভোট নিতে হবে।’

এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সাবেক রায়গঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ভিপি আইনুল হক। বিএনপির প্রার্থী আইনুল হক বলেন, ‘স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সামনের সারি থেকে লড়াই-সংগ্রাম করেছি। অনেক রাজনৈতিক মামলায় অন্তঃত ছয়বার কারাবরণ করতে হয়েছে। তবু জাতীয়তাবাদী দলের আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হইনি। নিঃস্বার্থভাবে দলের নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছি। তাই দল থেকে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আশা করছি, আমার আসনের ভোটার আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবে।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে দলীয় ও সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য প্রফেসর ড. শায়খ মাওলানা আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী কাজ করে মানুষের জন্য। দল আমাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ লক্ষ্যে প্রতিদিনই সাংগঠনিক কার্যক্রম ও এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। জনসংযোগ করছি, উঠান বৈঠক করছি, মানুষ আমাদের পাশে আছে। মসজিদ-মাদরাসা ও পাড়া-মহল্লায় সমবেত হয়ে বৈঠক করছি ও ভোটারদের সমর্থন চাইছি। ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তাই জনগণের সেবা করার লক্ষ্যে আমরা দিনরাত এক করে তাদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। আশা করছি, ভোটাররা আমাকে বিপুল ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ নির্বাচনে জনগণ যদি আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে, তাহলে এলাকাকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজমুক্ত করব। আমার এলাকায় রাস্তাঘাট, যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ ও নাজুক সেগুলোর উন্নয়ন করব। যেহেতু আমি একজন শিক্ষানুরাগী তাই যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। এ ছাড়া নারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করব। তাই নির্বাচন কমিশনের কাছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য দাবি করছি।’

এ আসনটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে দিলশানা পারুল নামে একজনকে মনোনয়ন দিলেও এখনো তাকে ভোটের মাঠে দেখা যায়নি। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিক নেতারা গত কয়েকটি নির্বাচনে অংশ নিলেও আসন্ন নির্বাচনে তাদের কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে।