সিলেট ব্যুরো

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত দুষ্কৃতিকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরপরই সিলেটে একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, এরা নিয়মিত একের পর এক ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধ করে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে নগরীর অভিজাত এলাকা নামে খ্যাত হাউজিংএস্টেট এলাকায় দিনদুপুরে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের পর নগর জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কিন্তু এ ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও আজ পর্যন্ত পুলিশ ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি। অবশ্য পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা বলেছেন, অচিরেই চিহ্নিতদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশ কাজ করছে।

অন্যদিকে সিলেটের সচেতনমহল দাবি করছেন আম্বরখানা-সুবিদবাজার এলাকায় ছিনতাইর ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের সুবিদবাজার ও আম্বরখানা এলাকার দুটি ঘটনা ব্যাপক আলোচিত ছিল। অনেকের কাছে আম্বরখানা-সুবিদবাজার এলাকা ছিনতাই-অপহরণের ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এদিকে, হাউজিং এস্টেটের ঘটনার পর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে চেক পোস্ট বসিয়ে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের কাগজপত্র চেক করছে পুলিশ।

গত মঙ্গলবার সিলেটের হাউজিং এস্টেটে দিনেদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় হতভম্ব এলাকাবাসী। এজন্য নগরবাসীর মধ্যে বেড়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আম্বরখানা থেকে সুবিদবাজার পর্যন্ত একাধিক অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। এরা সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই-অপহরণ করে থাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এভাবে একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলেও প্রাণের ভয়ে কেউ মুখ খুলে কিছু বলছেন না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া হাউজিংএস্টেট এর ছিনতাইর ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতিরোধ করার পর একজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে অটোরিকশার ভেতরে থাকা নারী যাত্রীর ব্যাগ ধরে টানাটানি করে। টানাহ্যাঁচড়ার পর ব্যাগটি নিজের আয়ত্বে নিয়ে মোটরসাইকেল আরোহীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ঘটনার শিকার ওই নারীও পরক্ষণেই অটোরিকশা থেকে নেমে চিৎকার করতে থাকেন। ওই নারী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সিএনজি অটোরিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন। এ ঘটনায় ওই নারী এয়ারপোর্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল চারটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে আটক কিংবা শনাক্তের কথা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে, আম্বরখানা সুবিদবাজার এলাকায় সংঘটিত গত বছরের দু’টি ছিনতাইর ঘটনা ব্যাপক আলোচিত ছিল। জানা যায়, ওই বছরের ৭ জুলাই এয়ারপোর্ট সড়ক থেকে দুই ছিনতাইকারীকে স্থানীয় লোকজন আটক করে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। আটক ছিনতাইকারীরা হচ্ছে, জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জের আব্দুল হকের পুত্র সাইফুল ইসলাম (২৫) ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের গৌরিনগরের জাহাঙ্গীর আলমের পুত্র লিমন আহমদ জয় (২৬)। এর মধ্যে সাইফুল ইসলাম নগরের সেনপাড়া আর লিমন নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় বসবাস করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক প্রাইভেট কারে তুলে এয়ারপোর্টের দিকে নিয়ে চলে যায়। প্রথমে ছিনতাইকারীরা অপহƒত কামালকে হাউজিং এস্টেটের ৮নং লেনে নামিয়ে দেবে বললেও পরবর্তীতে এয়ারপোর্টের দিকে নিয়ে যায় এবং তার সাথে থাকা স্মার্ট ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। কামালকে এয়ারপোর্ট হয়ে বাইশটিলার দিকে নিয়ে যাবার সময় প্রাইভেট কার থেকে চিৎকার করতে থাকে কামাল। গ্র্যান্ড সিলেটের সামনে আসার পরে কামাল প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে সাইফুল ও লিমনকে হাতে নাতে আটক করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট থানায় কামাল বাদী হয়ে ৩০ জুলাই মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-২০। ধারা ৩৯৪’ প্যানাল কোড ১৮৬০। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিধান দেব জানিয়েছেন, চার ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বর মাসে এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

এর আগে ওই বছরেরই ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় সুবিদবাজার পয়েন্ট থেকে জগন্নাথপুরের ব্যবসায়ী ছালিক আহমদকে ধারালো অস্ত্রের মুখে প্রকাশ্যে জোরপূর্বক একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে অপহরণ করে ফাজিলচিশত গলির ভেতরে নিয়ে যায়। ছালিক অপহরণের বিষয়টি তখন আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি অটোরিকশার চালকরা কেবল ফেলফেল করে দেখছিলেন। গলির ভেতরে টানা একঘণ্টা তাকে নির্যাতন করে তার পরিবারের সাথে কথা বলায়। অপহরণকারীরা সাফ বলে দেয়, টাকা না দিলে ছালিককে ছাড়া হবে না। জীবন রক্ষায় ছালিকের স্বজনরা একঘণ্টার মধ্যে বিকাশ করে এক লাখ টাকা অপহরণকারীদের দেয়া চারটি নম্বরে পাঠান। পরে ছালিককে ছেড়ে দেয়া হয় কিন্তু বলে দেয়া হয়, ঘটনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করলে তোমার প্রাণে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এ ঘটনার পর ছালিক চারটি নম্বরের আদ্যপান্ত বের করেন। তখন এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি আমলেই নেননি।

গত মঙ্গলবারের ছিনতাইয়ের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা, নগরীর ৪নং ওয়ার্ডের চারবারের নির্বাচিত সাবেক কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী দৈনিক সংগ্রামকে জানান, টানা বিশ বছর ধরে এই এলাকার জনপ্রতিনিধি ছিলাম। কিন্তু কখনো এ রকম ঘটনা ঘটেনি।

তিনি বলেন, আমি নিজেসহ এ এলাকার বাসিন্দারা হাউজিং এস্টেটের সড়ক বলতে আমরা নিজের বাড়ীর আঙ্গিনার মতো মনে করি। আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় যদি এ রকম ঘটনা ঘটে তাহলে আর আমাদের নিরাপত্তা কোথায়। স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতংক তৈরি হয়েছে। পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। এব্যাপারে পুলিশ কমিশনারকে রীতিমতো আমি চাপ দিয়ে যাচ্ছি। ছিনতাই, চুরিসহ এসব ঘটনায় যে কেউ জড়িত থাকুক তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ছিনতাইকারীদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

অন্যদিকে এসএমপি’র মুখপাত্র ও ডিসি (উত্তর) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, গত মঙ্গলবারের ছিনতাইকারীসহ এ অপরাধ চক্রের বিষয়ে পুলিশ শনাক্ত করতে পেরেছে। কাদের নেতৃত্বে হচ্ছে, কারা শেল্টার দিচ্ছে সবই পুলিশ বের করেছে। হাউজিং এস্টেটের ঘটনায় ইতোমধ্যে শনাক্তের কাজে বেশ অগ্রগতি আছে। যেকোনো সময় একটা ফলাফল পাওয়া যাবে। অপরাধ নির্মূলে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এদের নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে বলে জানান এসএমপি পুলিশের এ উর্দ্ধতন কর্মকর্তা।

গত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর কিছু চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী খোলস পাল্টিয়ে সক্রিয় হয়ে ছিলো। স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে এরা পালিয়ে গেলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের পর ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারীরা আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এদের কঠোর হস্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমন না করলে পুরো নগরজুড়ে অপরাধীদের আবাস্থল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন এ এলাকার সচেতন বাসিন্দারা।