দেশীয় ফলের মৌসুম না থাকায় চলতি রমযানে বাজার অনেকটাই আমদানিকৃত ফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ ফল আমদানি করেছেন। টাকার অংকে যার পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। পাইকারি আড়ত থেকে খুচরা দোকান ও ফুটপাতের ভ্যান-সবখানেই এখন আমদানিকৃত ফলের আধিপত্য।

রমযানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুর, আপেল, আঙ্গুর, কমলা ও মাল্টার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে এ সময় মোট ২ লাখ ১৩ হাজার ৬০৭ মেট্রিক টন ফল আমদানি হয়েছিল। আর ২০২৫ সালে একই সময়ে আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৪ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে আমদানি বাড়লেও বাজারে ফলের দাম কমেনি; বরং প্রতি কেজিতে গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিনই কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৭৫৭ কোটি টাকার ৮৬ হাজার ৯৯১ মেট্রিক টন আপেল, ৫২০ কোটি টাকার ৪৪ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন আঙ্গুর, ৪৩৮ কোটি টাকার ৫০ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন মাল্টা এবং ৪৯৬ কোটি টাকার ৫৬ হাজার ৯৯৫ মেট্রিক টন কমলা খালাস হয়েছে। এছাড়া ৯২৬ কোটি টাকার ৪১ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। এসব ফল এখন রমযানের বাজার দখল করে আছে।

কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, খেজুর ছাড়া অন্যান্য ফল আমদানিতে সর্বোচ্চ ১৩৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সম্প্রতি ২ হাজার ২১১ কোটি টাকার ফল আমদানির বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। পুরো রমজান বিবেচনায় আমদানি ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি ফলের বাজার চট্টগ্রামের ফলম-ি ঘুরে দেখা গেছে, আড়ত ও গুদামগুলো ফলে পরিপূর্ণ। বাজারের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। কোথাও বন্দর থেকে ফল নামানো হচ্ছে, আবার কোথাও দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টা আসে মিশর ও চীন থেকে, আপেল পোল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মালদোভা থেকে, আঙ্গুর ভারত থেকে এবং কমলা চীন থেকে আমদানি করা হয়। তাদের দাবি, উচ্চ শুল্ক, রেফার কন্টেইনার ভাড়া, দ্রুত খালাসের অতিরিক্ত ব্যয় ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে ফল আমদানির ব্যয় অনেক বেশি পড়ে। ফলে বাজারে দাম কিছুটা চড়া থাকছে।

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম জানান, পাইকারি পর্যায়ে ২০ কেজির আপেলের কার্টন ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৬ হাজার টাকা, সাড়ে ৮ কেজির কমলার কার্টন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ১০ কেজির আঙ্গুরের কার্টন ২ হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং ১৪ কেজির মাল্টার কার্টন ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোজা শুরুর এক সপ্তাহ আগেও প্রতিটি ফলে কেজিতে ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত কম ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, সরকার আমদানিকৃত ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে শুল্ক হ্রাস করা হলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ-এর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, বর্তমানে বন্দরে ১ হাজার ২৩৩ টিইইউস বিশেষায়িত রেফার কন্টেইনার রয়েছে, যার অধিকাংশেই ফল সংরক্ষিত আছে। রমজান পরবর্তী সময়ে এসব ফল বাজারে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, রমযানের শুরু, মাঝামাঝি ও ঈদের আগে-তিন দফায় ফলের দাম বাড়ানো হয়। তার দাবি, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি চক্র বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে। বন্দরে ফলভর্তি কন্টেইনার থাকলেও সেগুলো পর্যাপ্ত হারে বাজারে আনা হচ্ছে না। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে আমদানিকৃত ফল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।