মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা : বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস। এ উপলক্ষে দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বিপন্ন প্রাণীকুল সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন প্রাণীপ্রেমী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সুন্দরবনের বহু প্রজাতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে, যা পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবছর ৩ মার্চ দিবসটি পালিত হয়। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনে এ দিনকে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর সকল প্রাণীর জন্য নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা এবং প্রাণীকল্যাণ বিষয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ‘ধরা’ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্য নূর আলম শেখ বলেন, বনের বিভিন্ন স্থানে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করা হচ্ছে এবং এসব ফাঁদে বাঘও আটকা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে। পাশাপাশি নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনায় পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বনাঞ্চলে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে এবং তাদের একটি অংশ বন্যপ্রাণী পাচারের সঙ্গে জড়িত। এসব অপরাধ দমনে দায়ীদের গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, মানুষের টিকে থাকার সঙ্গে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ সরাসরি সম্পর্কিত। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় উদ্ভিদ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, একসময় দেশে শকুনসহ বিভিন্ন প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল, তবে বর্তমানে তা হ্রাস পেয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও আগের তুলনায় কমে আসছে। প্রজাতি বিলুপ্তির পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কার্যক্রমও ভূমিকা রাখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের মাধ্যমে এসব বিষয়ে আলোচনা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার করাই প্রধান লক্ষ্য।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং এখানে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন অবস্থিত। এই বনাঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রাহরিণসহ বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং অবৈধ শিকার কার্যক্রম এ সম্পদকে হুমকির মুখে ফেলছে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় আইন প্রয়োগ জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণীর সংখ্যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে। গত এক শতকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে অন্তত ৩১টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।