রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলার ৩৯টি আসনের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে সহিংসতার আশঙ্কাও বাড়ছে। ফলে এসব কেন্দ্রকে প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও নজরদারি করা হচ্ছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের সূত্রমতে, রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার ৫ হাজার ৫০৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২ হাজার ৭৮৬ ভোটকেন্দ্র প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বগুড়ার আসনের ৯৮৩ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫০১টি ঝুঁকিপূর্ণ। রাজশাহীর ছয়টি আসনের ৭৭৮টি কেন্দ্রে ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৩৯টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে রাজশাহী ও বগুড়ায়। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে ৫১৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ। নাটোরের ৪টি আসনের ৭৮০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ। নওগাঁর ৬টি আসনের ৭৮২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৬৪টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ৬টি আসনে ৯২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৬২টি ঝুঁকিপূর্ণ। পাবনার ৫টি আসনে ৭১২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৬৯টি ঝুঁকিপূর্ণ। জয়পুরহাটের ২টি আসনে ২৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৭৬টি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ভোটকেন্দ্রগুলোয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। এ বিষয়ে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ড. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ শান্তিপূর্ণ আছে। তবে শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিভিন্ন জায়গায় যেসব অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে- তাতে কিছুটা তো শঙ্কা থেকেই যায়। তার পরেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক তৎপর রয়েছে। নির্বাচনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।”
অস্ত্র উদ্ধার: আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, র্যাব-৫ বাগমারা উপজেলার বইকুড়ি সরদারপাড়া এলাকা থেকে ১৬টি ছুরি, ৪টি চাপাতি, ৪টি হাসুয়া এবং ৩২টি কুঠারসহ মোট ৫৬টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। ৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবি বাঘা থানার রাওথা সীমান্ত এলাকা থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন এবং ৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে, যা পাচারকারীরা মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি নগরীর শাহমখদুম থানার ফুদকিপাড়া এলাকা থেকে র্যাব ১টি বিদেশী রিভলভার, ১টি ওয়ান-শুটার গান, ২টি এয়ারগান এবং ২০ রাউন্ড গুলী উদ্ধার করে। গত ২২ জানুয়ারি রাজশাহী মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ থানা থেকে লুটকৃত ১৩ রাউন্ড শটগানের গুলী এবং পুলিশের ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রামে ৬৫৫ কেন্দ্রে ঝুকিপূর্ণ
চট্টগ্রাম ব্যুরো: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলার মোট ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৬৫৫টি কেন্দ্রকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা ও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এসব কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এসব কেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারসহ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মকর্তারা আরও জানান, কারিগরি কারণে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ শব্দের পরিবর্তে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী, নগরীর চারটি সংসদীয় আসন ও হাটহাজারীর একটি অংশ নিয়ে ১৬টি থানার আওতায় রয়েছে ৬০৭টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ৩১০টি কেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নগরীর খুলশী থানায় সর্বাধিক ৪৪টি কেন্দ্র অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যেখানে মোট কেন্দ্র সংখ্যা ৪৭টি। আকবর শাহ থানার আওতাধীন ২৩টি কেন্দ্রের সবকটিই অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে বন্দর থানায় কোনো কেন্দ্রকে এই শ্রেণিতে রাখা হয়নি। এছাড়া কোতোয়ালী থানায় ৫২টির মধ্যে ৩৮টি, সদরঘাটে ২৩টির মধ্যে ১৫টি, চকবাজারে ১৬টির মধ্যে ৪টি, বাকলিয়ায় ৩৯টির মধ্যে ১৩টি, চান্দগাঁওয়ে ৫৬টির মধ্যে ২৭টি, পাঁচলাইশে ৩২টির মধ্যে ১৯টি, বায়েজিদ বোস্তামীতে ৫৬টির মধ্যে ১৮টি, ডবলমুরিংয়ে ৪৮টির মধ্যে ১৮টি, হালিশহরে ৪২টির মধ্যে ৩২টি, পাহাড়তলীতে ২৮টির মধ্যে ২০টি, ইপিজেড এলাকায় ৩১টির মধ্যে ১৩টি, পতেঙ্গায় ২৫টির মধ্যে ৭টি এবং কর্ণফুলী থানায় ৪৭টির মধ্যে ১৯টি কেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিএমপির ডেপুটি কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. রইছ উদ্দিন জানান, সব ভোটকেন্দ্রকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে কিছু কেন্দ্রকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় অতিরিক্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের আওতাধীন ১ হাজার ৩৫৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৪৫টিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপজেলা ভিত্তিতে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় সর্বোচ্চ ৬৮টি কেন্দ্র এই তালিকায় রয়েছে। এছাড়া সীতাকুণ্ডে ৪৮টি, চন্দনাইশে ৪২টি, বাঁশখালীতে ৪১টি, হাটহাজারীতে ৩০টি, সন্দ্বীপে ২৪টি, পটিয়ায় ২৪টি, বোয়ালখালীতে ২৫টি, রাউজানে ২১টি, আনোয়ারায় ১৩টি, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় ৬টি এবং ভূজপুরে ৩টি কেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, জেলার ভোটকেন্দ্রগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে এবং কেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনায় মোবাইল টিমও দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরাও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে একজন সশস্ত্র সেকশন কমান্ডারের নেতৃত্বে চারজন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এবং একজন সশস্ত্র আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় থাকবেন একজন সশস্ত্র আনসার সদস্য, একজন সশস্ত্র সহকারী সেকশন কমান্ডার, লাঠিসহ চারজন নারী আনসার এবং ছয়জন পুরুষ আনসার সদস্য।
এছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, উপকূলীয় এলাকায় কোস্ট গার্ড, র্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শক্রমে পুলিশ কমিশনার মোতায়েন সদস্যসংখ্যা সমন্বয় করতে পারবেন। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে দায়িত্ব পালন করবে এবং সশস্ত্র বাহিনীও ছয় দিন দায়িত্বে থাকবে।