শ্যামনগর থেকে ফিরে কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ঐতিহ্যবাহী আইবুড়ি নদী দখল ও ভরাটে অস্তিত্ব হারানোর পথে। নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে মাছের প্রজেক্ট, বসতঘর ও দোকানপাটসহ নানা অবৈধ স্থাপনা। নদী উদ্ধারে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে একাধিকবার উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
সূত্রে জানা যায়, শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট থেকে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের হেতালখালী পর্যন্ত প্রবাহিত নদীটি একসময় ছিল পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌ-যোগাযোগের মাধ্যম। বর্তমানে প্রভাবশালী একটি চক্র নদীর তীর দখল করে অবৈধভাবে মাছের ঘের, ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নদীর প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানির ধারণক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের গ্রামগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে বসতভিটা, কৃষিজমি, পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গিয়ে প্রতিবছর শত শত পরিবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
আইবুড়ী নদীর পারের বাসিন্দা আয়শা বেগম, জয়গুন বিবি, শ্রীমতী সুধা রাণী মৃধা দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ”একসময় আইবুড়ি নদী ছিল এলাকা বাসীর প্রাণ। ভারী বর্ষণ হলেও নদী দিয়ে সহজেই পানি নেমে যেত, জলাবদ্ধতা হতো না। কিন্তু এখন নদীর দুই পাড় দখল করে ভরাট করে ফেলায় সেটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি নামতে পারে না, ঘরবাড়িতে হাঁটুসমান পানি উঠে যায়। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। রান্না করা যায় না, টয়লেট ব্যবহার করা যায় না, ঘরের ভেতরে বসবাস করা দায় হয়ে পড়ে। প্রতিবছর বর্ষা এলে আমরা আতঙ্কে থাকি, কখন আবার পানি ঢুকে সব কিছু তছনছ করে দেয়।”’
শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামের আবু তালেব বলেন, ”প্রতিবছর বর্ষায় পুকুরের মাছ ভেসে যায়, ঘরের আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যায়। অনেক কষ্টে লোনাপানি সহ্য করে যে মাছ চাষ করি, এক রাতের পানিতেই সব শেষ হয়ে যায়। ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়। বাচ্চাদের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়।” আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘বহুবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি, লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। নদী যদি দখলমুক্ত না হয়, তাহলে আমাদের এই ভোগান্তির শেষ থাকবে না।’
শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট এলাকার মোঃ জয়নাল মোড়ল, আব্দুল কাদের মোড়ল বলেন, ‘আইবুড়ী নদীর বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে নেট পাটা বসিয়ে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। আগে ভাটার সময় পানি দ্রুত নেমে যেত, আর জোয়ারে নদী নিজস্ব গতিতে চলাচল করত। এখন কৃত্রিমভাবে প্রবাহ আটকে দেওয়ায় নদীতে পলি জমে তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে নদী দ্রুত ভরাট হচ্ছে। গভীরতা কমে যাওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আশপাশের গ্রামগুলোতে।’ তারা আরো বলেন, ‘বৃষ্টির পানি নামতে না পেরে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই নদীর অস্তিত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।’
এলাকাবাসীর দাবি, আইবুড়ি নদীকে অবিলম্বে দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নেট পাটা অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় খনন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশিষ্ট প্রশাসনের আশু পদক্ষেপ চান তারা।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আইবুড়ি নদী দখল ও ভরাটের অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রকৃত চিত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন বদ্ধপরিকর। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে নদী দখলের সুযোগ দেওয়া হবে না।