মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে: ঢাকঢোলের তালে, কাসার ঘন্টার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে বাগেরহাটের মংলা উপজেলার জনবহুল এলাকাগুলো। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে পালটা চালানো, ছন্দময় কৌশলে আঘাত হানা—এইসব দৃশ্য এখন নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে লাঠি খেলার আসরে। দর্শকদের চোখে মুগ্ধতা, চারপাশে উত্তেজনা আর করতালির গুঞ্জনে মুখর জনতার ঢল। এককথায়, গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা যেন নতুন প্রাণ পেয়েছে।
সুন্দরবনের সন্নিকটে, সাগর উপকূলবর্তী এই জনপদে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। সম্প্রতি, এখানকার তরুণ সমাজকে মাদকাসক্তি ও অনৈতিক প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে এবং হারিয়ে যেতে বসা আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন পেরিখালি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোল্লা আল মামুন।
একসময় স্কুল শেষে টিউশনিতে সময় দিতেন তিনি। এখন সেই সময় ব্যয় করছেন লাঠি খেলা, লোকসংগীত ও পুথি পাঠের আয়োজন করতে। হাটে-বাজারে, গ্রামীণ জনসমাগমে তিনি নিজেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন এসব সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে।
মোল্লা আল মামুন বলেন, “আমরা বাঙালি। আমাদের আছে চিরায়ত ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি। কিন্তু সময়ের স্রোতে আমরা অনেকটাই সরে এসেছি সেই মূল থেকে। একজন শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধরে রাখতেই হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি লাঠি খেলার প্রতি আগ্রহী হয়েছি। এটি গ্রামবাংলার শতবর্ষের পুরনো ঐতিহ্য, যা আমাদের গোয়ালিরমেট গ্রামে এখনও টিকে আছে। আমি চেষ্টা করছি নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করে এই খেলাকে টিকিয়ে রাখতে।”
তার সঙ্গে আছেন আরও ১২ জন নারী-পুরুষ ও শিশুসহ একটি স্বেচ্ছাসেবী দল। তারা শুধু লাঠি খেলাই নয়, মুখে সূঁই ফোটানো, মাথায় পানির গ্লাসের উপর কলসি তুলে ঘোরানোসহ নানা ঐতিহ্যবাহী কসরত প্রদর্শন করেন। শিশুদেরও শেখানো হচ্ছে এসব কৌশল, যাতে প্রজন্ম ধরে চলতে পারে এই সংস্কৃতির চর্চা।
একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমরা এই খেলা ধরে রাখার জন্য ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে শিখেছি, খেলেছি। এখন তারাও অংশ নিচ্ছে।”
এক শিশু অংশগ্রহণকারী জানায়, “আমার আব্বু, চাচা, ভাইয়া সবাই এই খেলা খেলেন। আব্বু বলেছেন, আমি যেন শিখি। যদি আমি না থাকি, তাহলে যেন ঐতিহ্যটা তুমি ধরে রাখতে পারো।”
আরেকজন প্রবীণ খেলোয়াড় বলেন, “আমি দিনমজুরির কাজ করি, তারপরও সময় বের করে খেলি। ছোটবেলা থেকেই আমার দাদা খেলতেন, আব্বা খেলতেন, আমি খেলি, আমার বড় ভাই খেলেন, আমার ছেলেরা খেলছে। আমরা দুই ভাই, তিন ছেলে—সবাই এই খেলায় যুক্ত। আমাদের বাপ-দাদারা যেমন ছিলেন, আমরাও যেন তাদের মতো টিকে থাকতে পারি।”
শুধু মাঠে-ঘাটে নয়, এই দলটি এখন সক্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও। আঞ্চলিক গান, নাটক, গল্প বলার মাধ্যমে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য। একজন সদস্য বলেন, “আমাদের আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে আমরা গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছি। এজন্য নিজেকে ধন্য মনে করি।”
তাদের বিশ্বাস, কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যÑলাঠি খেলা, আঞ্চলিক গান, পুথি পাঠ—টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। তবেই শিশু-কিশোরদের মোবাইল নির্ভরতা কমবে, তরুণরা দূরে থাকবে নেশা ও অসামাজিক কর্মকা- থেকে।