খুলনা ব্যুরো
৬ টি সংসদীয় আসনের ৯ টি উপজেলায় নির্বাচনের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট পেপার খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখা হতে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
ট্রেজারি সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকল যাচাই-বাছাই শেষে ব্যালট বক্স হস্তান্তর করা হয়। সোমবার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে এবং মহানগরীর দু’টি আসনে পাঠানো হয়। এর আগে গত শনিবার এখান থেকে উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচনি অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠানো হয়। উক্ত ব্যালট পেপার সংগ্রহকালে বিদেশি নির্বাচন পরিদর্শক হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শ্রীলঙ্কা থেকে আগত পরিদর্শক টিম পরিদর্শন করেন।
খুলনা জেলা নির্বাচন অফিসার মো. সোহেল সামাদ বলেন, ভোট কেন্দ্রের নির্বাচনের ব্যালট পেপার ও গণভোটের ব্যালট পেপার সোমবার সকল সরকারি রিটার্নিং অফিসার এর কার্যালয় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি ৮৪০টি ভোট কেন্দ্রে নির্বাচনি সকল সরঞ্জামাদি পৌঁছে যাবে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার জন্য নির্ধারিত সময়ও শেষ। এখন শুধু অপেক্ষা ভোটের দিনের। আর সেই অপেক্ষার আর মাত্র একদিন বাকি। কিন্তু যাদের নিয়ে এত আয়োজন, সেই উপকুলের ভোটাররা রয়েছেন নানামুখী ভাবনায়। উপকূলের মানুষ উন্নয়নের কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত। সুন্দরবন বেষ্টিত এই অঞ্চলটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের।
জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই অঞ্চলের মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে আছে। প্রতিবার জাতীয় নির্বাচন এলেই দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিভিন্ন পথসভা জনসভায় প্রার্থীদের মুখে শোনা যায় মানুষের সমস্যা সমাধানের নানা আশ্বাস। নদীভাঙন রোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি- প্রতিটি নির্বাচনি প্রচারণায় এসব প্রতিশ্রুতি নতুন করে উঠে আসে।
টেকসই বেড়িবাঁধ নেই, নদীভাঙন আর জলাবদ্ধতা প্রতিদিনের সঙ্গী, কর্মসংস্থানের অভাবে জীবিকা অনিশ্চিত এই বাস্তবতা নিয়েই খুলনা-৬ আসনের উপকূলের ভোটাররা নির্বাচনের মুখোমুখি। ভোটের মাঠে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির ভাষা বদলালেও উপকূলবাসীর জীবনের সংকটগুলো যেন একই রয়ে গেছে।
কয়রার বিভিন্ন ইউনিয়নের গুচ্ছ গ্রামগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জীবন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক পরিবার এখনো নদীর চর কিংবা ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বাস করছে। গুচ্ছ গ্রামগুলোতে নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নারী শিশুদের মাঝে রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুকি।
উপজেলার কয়রা ইউনিয়নের নদীভাঙন কবলিত এলাকা গোবরা ঘাটাখালী গ্রামের বাসিন্দা আছিয়া বেগম বলেন, “আমার ঘর-বাড়ি জমি সব নদীতে চলে গেছে এখন গুচ্ছ গ্রামে একটা ছোট্র ঘরে বস বাস করি। কিন্তু এখানেও জোয়ার এলে নদীর পানিতে তলিয়ে যায় সবকিছু। নির্বাচনের সময় সবাই ভোট চাইতে আসে, বলে ভাঙন বন্ধ করবে। বাঁধ করে দেবে। কিন্তু ভাঙন বন্ধ হয় না। আমরা এমন একজন মানুষ চাই, যিনি সত্যিই আমাদের বিপদে পাশে দাঁড়াবেন। আমাদের জন্য কাজ করবেন।”
এই উপজেলার বাগালি ইউনিয়নের শেওড়া গ্রামের বৃদ্ধ রইচ উদ্দিন বলেন, “দীর্ঘ এই জীবনে আমি অনেক নির্বাচন দেখেছি। প্রতিবারই নেতারা ভোটের জন্য এই এলাকায় আসেন। তারা বলেন, উপকূলের উন্নয়ন হবে, পানি সমস্যা দূর হবে। কিন্তু বয়সের এই সময়ে এসেও সেই একই কষ্ট ভোগ করছি। এবার আমরা এমন কাউকে চাই, যিনি কথা কম বলবেন, কাজ বেশি করবেন।”
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় জেলেদের দুর্ভোগ আরেক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সুন্দরবনের ভেতরে সক্রিয় ডাকাতচক্রের আতঙ্কে দিশেহারা তারা। মাছ ধরতে গিয়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনা এখনো থামেনি। স্থলে থাকা ডাকাত সহচরদের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে একধরনের কার্ড নিয়ে তাদের জংগলে ঢুকতে হয়। জেলেরা বলছেন, “নিরাপত্তার আশ্বাস অনেকবার মিলেছে, কিন্তু বাস্তবে ঝুঁকি নিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।”
এদিকে পানি নিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি খালগুলো ইজারা দেওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বর্ষার সময় ফসলি জমি ডুবে যায়, মিঠা পানির উৎস লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব। সুন্দরবন বেষ্টিত এলাকাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা থাকলেও স্থানীয় মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব সংকটই এখন উপকুল বাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নির্বাচনি প্রচারণায় প্রার্থীরা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, সুন্দরবনে জেলেদের নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কেউ পর্যটন শিল্পকে কাজে লাগানোর কথা বলছেন, কেউ আবার খাল রেল লাইন, কম সময়ে জেলা সদরে যাতায়াতের জন্য বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ পুনর্বাসন প্রকল্পের আশ্বাস দিচ্ছেন।
তবে ভোটারদের অভিজ্ঞতা তাদের সতর্ক করে তুলেছে। অতীতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নজির খুব বেশি নেই বলে মনে করছেন অনেকে। তাই এবার তারা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তব উদ্যোগ দেখতে চান।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যেভাবে উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন, নির্বাচিত হওয়ার পর সেটা কাগজে কলমে খেয়ে ফেলেন। ফলে উপকূলের মানুষের দূর্ভোগ থেকেই যায়। আমরা আশা করি জুলাই গণ অভুথ্যান পরবর্তী বাংলাদেশে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ এ যে প্রার্থীই বিজয়ী হোক তিনি মুখের কথার সাথে কাজের মিল দেখাবেন।
উপকূলের উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার ভোটাররা তাই এবার শুধু জনপ্রতিনিধি নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দিতে চান এমন নেতৃত্বের হাতে যিনি সত্যিই উপকূলের বাস্তবতা বোঝেন এবং কথা নয়, কাজে প্রমাণ রাখবেন।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, অবহেলার ভার আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দোলাচলে দাঁড়িয়ে কয়রার মানুষ আবারও ভোট দিতে প্রস্তুত। বাঁধ ভাঙার জ¦ালা বুকে নিয়েই তারা শুনছে নতুন আশ্বাস। এখন অপেক্ষা এই আশ্বাসগুলো কি এবার বাস্তব উন্নয়নের পথে হাঁটবে, নাকি উপকূলের মানুষের জীবনে যুক্ত হবে আরও একটি অপূর্ণ প্রত্যাশার অধ্যায়।