জীবিকার তাগিদে বনমুখী মানুষেরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমকে ঘিরে, তখনই অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও অভিযোগে ঘেরা এক বাস্তবতা সামনে আসছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে মধু আহরণ ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে টানা ২ মাস চলবে। এ মওসুম ঘিরে একদিকে যেমন সরকারি প্রস্তুতি ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বেড়েছে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি ও অবৈধ মধু আহরণের অভিযোগ।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সুন্দরবন পশ্চিমের খুলনা রেঞ্জে ৭০০ কুইন্টল মধু ও ২১০ কুইন্টাল মোম ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬শ’ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে ৩ হাজার ৮ কুইন্টাল হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও কমে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছঠে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। তবে অবৈধভাবে সংগৃহীত মধু এ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
বন বিভাগের তথ্য মতে, গত কয়েক বছরে মধু আহরণের পরিমাণ ওঠানামা করেছে। ২০২১ সালে ৪,৪৬৩ কুইন্টাল, ২০২২ সালে ৩,০০৮ কুইন্টাল, ২০২৩ সালে, ২,৮২৫ কুইন্টাল, ২০২৪ সালে ৩,১৮৩ কুইন্টাল, ২০২৫ সালে ২,০৭৬ কুইন্টাল মধু আহরন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল কাজ করেছেন, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজারে। এবছর তা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় মৌয়ালরা বলছেন, বাঘের তুলনায় বনদস্যুদের নির্যাতন বেশি ভয়ংকর। দস্যুরা তাদের আটক করে মধু ও মাছ ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া মুক্তিপণের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ আদায় ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। এ পরিস্থিতিতে চলতি মওসুমে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মওসুমের শুরুতে খলিশা ফুলের মধু পাওয়া যায়, যা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও দামি। এরপর পর্যায়ক্রমে গরান, কেওড়া ও ছইলাফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। তবে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এ বছর কাক্সিক্ষত পরিমাণ মধু পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কয়রার মৌয়াল মোকছেদ আলী জানান, “এলাকায় কাজ না থাকায় ধারদেনা কাে বনে যাচ্ছি। মধু না পেলে ঋণের বোঝা বাড়বে। আবার দস্যুদের হাতে পড়লে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।”
আরেক মৌয়াল আমিরুল জানান, এবছর ডাকাতের যা উৎপাত শুনছি তাতে চালান বাচবে কি না বুঝতে পারছি না। বাজার সদয় করা না হয়ে গেলে এ বছর বনে মধু কাটতে যেতাম না।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার মৌয়াল দলনেতা আব্দুর রাজ্জাক জানান, ১২ জনের দল নিয়ে তারা প্রস্তুত। নির্ধারিত সময়েই পাস নিয়ে বনে যাবেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দস্যু আতঙ্কে কমছে মৌয়াল।
স্থানীয় মৌয়ালদের অভিযোগ, সুন্দরবনে এখন আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে বনদস্যু চক্র। তারা অপহরণ, নির্যাতন এবং চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে মৌয়ালদের জিম্মি করে ফেলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল জানান, প্রতি মৌয়ালের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক গ্রুপকে আলাদা করে টাকা দিতে হচ্ছে।
শ্যামনগরের হরিনগরের মৌয়াল আমজাদ হোসেন বলেন, বাঘ-কুমিরের ভয় পাইনি কখনো, কিন্তু এখন ডাকাতের ভয়েই বনে যাওয়া বন্ধ করে দিতে চাই। একই গ্রামের নেসার আলী গাজী জানান, গতবার ৭ জনের দল ছিল, কিন্তু এবার কেউই যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। মুন্সিগঞ্জ এলাকার মৌয়াল বশির আলী মোড়ল বলেন, বন ডাকাতমুক্ত না হলে এ পেশা ছাড়তেই হবে। বুড়িগোয়ালিনীর দাঁতিনাখালীর মৌয়াল আবুল সানা জানান, ঋণ করে বনে গিয়ে যদি ডাকাতের হাতে সব হারাতে হয়, তাহলে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানে নেই।
বুড়িগোয়ালিনীর শাহাজান সরদার জানান, গত বছর বাঘের মুখোমুখি হয়ে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। কিন্তু এবার সেই পুরোনো ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক আতঙ্কÑবনদস্যু। মৌয়ালদের ভাষায়, আগে বাঘের ভয় ছিল, এখন মানুষের ভয় বেশি।
মওসুম শুরুর আগেই অবৈধভাবে মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি মাছ ধরার অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করে অপরিপক্ব মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করছেন। এক মৌয়াল জানান, অনুমতি ছাড়াই মধু কাটছি, বিনিময়ে কিছু অংশ দিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। তারা পাইকারি বাজারে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।
কয়রা কেয়ার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক মোহসিন আলম বলেন, উপকূলের মানুষেরা জীবিকার তাগিদে জীবনের মায়া ত্যাগ কাে বাঘ, কুমির আর সাপের ভয় উপক্ষো করে মধু আহরণ করে। তবে ৫ আগষ্টের পর থেকে সুন্দরবনে দস্যুতা ছেয়ে গেছে। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে জেলে ,বাওয়ালী ও মৌয়ালের পেশা হুমকির মুখে পড়বে।
বন বিভাগ দাবি করছে, কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যৌথ টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে মৌয়ালদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবে খুব একটা কার্যকর নয়। জীবনের ঝুঁকি পুরোনো, নতুন ভয় দস্যু। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ কখনোই ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বিষধর সাপ এবং প্রতিকূল পরিবেশ সবসময়ই মৌয়ালদের জন্য চ্যালেঞ্জ।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে নির্বিঘেœ মধু আহরণের জন্য বনবিভাগের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া এবার বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মৌয়ালদের সাবধানে চলাফেরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিপক্ব চাক কেটে মধু সংগ্রহ করলে মৌমাছির বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পুরো ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ভবিষ্যতে মধু উৎপাদনও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, মওসুম শুরু উপলক্ষে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবার প্রথমবারের মতো এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মৌয়ালদের পাস প্রদান করা হবে।
বনবিভাগ আশাবাদী অনুকূল আবহাওয়া থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে, যা সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াবে এবং হাজারো মৌয়াল পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, যদি দস্যুতা, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ আহরণ বন্ধ না হয়, তাহলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে মৌয়ালদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
সুন্দরবনের মধু শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ কার্যক্রমের কারণে এই খাত এখন হুমকির মুখে। ১ এপ্রিলের অপেক্ষায় থাকা মৌয়ালদের চোখে তাই শুধু সম্ভাবনা নয়, বরং শঙ্কার ছায়াও স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয় প্রশাসনের পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং মৌয়ালরা কতটা নিরাপদে তাদের পেশায় ফিরতে পারেন।