বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছেন। ঐতিহাসিক এ নির্বাচনের দুই মাসেরও কম সময় আগে তিনি দেশে ফিরলেন। লম্বা সময় বিদেশে থাকার পর তিনি দেশে ফেরাই রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে তার বিশ্লেষণ করেছে ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। বিশ্লেষণ করেছেন সংস্থাটির মিয়ানমার ও বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ থমাস কিন। গত বুধবার আইসিজি তাদের ওয়েবসাইটে বিশ্লেষণটি প্রকাশ করে।
থমাস কিন লিখেছেন, ‘জুন মাসে তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে নির্বাচন ও সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে একটি সমঝোতায় আসেন, যা তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেছে। বিএনপির নেতারা তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময় দলের ‘সবচেয়ে বড় সমাবেশ’ করলো। তারা আশা করছেন, নির্বাচনের প্রচারে তাঁকে উপস্থিত রাখা বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্য সহায়ক হবে। কর্মীরা আরও উজ্জীবিত হবেন।’
“দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া নিয়ে বিএনপির নেতারা উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে। তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং সহিংসতা নিয়ে ‘অপপ্রচার’-এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তারা। বিপরীতে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল এবং এক সময়ের বিএনপির মিত্র জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রথাগত রাজনীতি নিয়ে হতাশ তরুণরা জামায়াতের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিএনপি জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে কম সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দলটির জন্য খারাপ ফল হিসেবে দেখা হবে। এতে জামায়াত তার এজেন্ডা এগিয়ে নিতে এবং পরবর্তী নির্বাচনে প্রস্তুত হওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম পাবে।”
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দলটির প্রাপ্তি বৃদ্ধি করবে। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনে বিএনপি শক্তি অর্জন করলেও কিছু অনিশ্চয়তা আছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ থমাস কিন তাঁর বিশ্লেষণে বলেছেন, তারেক রহমান বিদেশে থেকে যোগ্যতার সঙ্গেই দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দলটির কর্মীরা তাঁর প্রতি অনুগত। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁকে বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতির জগতের বাইরে রেখেছিল। এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নির্ভর করছে তিনি হতাশ তরুণ ভোটারদের কতটা আকৃষ্ট করতে পারেন তার ওপর। একই সঙ্গে তা নির্ভর করবে তিনি কতটা স্পষ্ট বার্তা দিতে পারেন; মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থীদের কোন্দল মিটিয়ে দলকে কতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন এবং দেশকে টালমাটাল অবস্থা থেকে টেনে তুলে কাক্সিক্ষত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দিতে পারবেন, সে বিষয়ে কতটা আস্থা তৈরি করতে পারেন তার ওপর।
ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে এবং তারেক রহমান পরবর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এতে বলা হয়, তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসুস্থ। তিনি এখনও বিএনপির প্রধান, যদিও তা নামমাত্র। প্রকৃতপক্ষে তারেক রহমানই এক দশক আগে থেকে দল চালাচ্ছেন। গত বছর শেখ হাসিনার আকস্মিক পতনের আগ পর্যন্ত তাঁর দেশে ফেরা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। দৃশ্যত চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান ২০০৮ সালে দেশ ছাড়েন, যখন বাংলাদেশ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছিল। এর কয়েক মাস পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে বেশ কিছু অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তারেক রহমান সব সময় দাবি করে এসেছেন, অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের হাইকোর্ট সেগুলো থেকে তাঁকে খালাস দেন।