মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান) : বান্দরবানের আলীকদম ও লামার দুর্গম পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে কতশত মানুষের নীরব কান্নার গল্প। বিশেষ করে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন এখানে ছিল অবহেলা আর অন্ধকারের সমার্থক। তবে গত এক দশক ধরে সেই অন্ধকার অমানিশা চিরে আশার আলো ছড়াচ্ছে ‘এসডিডিবির’ একটি মানবিক উদ্যোগ। পাহাড়ের এই প্রান্তিক মানুষগুলো এখন আর সমাজের বোঝা নন, বরং তারা শিখছেন মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র।
নিজেকে আর বোঝা মনে হয় না : আলীকদম বাস টার্মিনাল এলাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। একসময় ঘরের কোণে পড়ে থাকা এই মানুষটি এখন ব্যস্ত থাকেন নিজের মুদি দোকানে। কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালিত এসডিডিবি প্রকল্পের সহায়তায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন পথের দিশা। ইলিয়াস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আগে কেউ আমাদের কথা শুনত না। এখন আমরা জানি কোথায় যেতে হয়, কীভাবে নিজের অধিকার চাইতে হয়। কারিতাস আমাকে শিখিয়েছে জীবন যুদ্ধ কীভাবে লড়তে হয়। এখন আমি দোকানদারি করি, নিজেকে আর বোঝা মনে হয় না।”
অভাবকে জয় করেছেন ফরিদা-নূর নাহার : চিওনী পাড়ার ফরিদা বেগমের এক হাত ও পা অবশ। জীবন যখন থমকে গিয়েছিল, তখন এসডিডিবি প্রকল্প তাঁর হাতে তুলে দেয় ছাগল পালনের দায়িত্ব। আজ তিনি স্বাবলম্বী। একই পাড়ার নূর নাহার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে ছাগল বিক্রি করে এখন গরু কিনেছেন। নূর নাহার বলেন, “আমার এই অর্জন শুধু টাকার নয়, এটি নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প।” অন্যদিকে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সরমনি ত্রিপুরা একসময় মানুষের তাচ্ছিল্যের শিকার হতেন। আজ তিনি প্রশিক্ষণ নিয়ে সভায় নিজের অধিকারের কথা বলেন। তাঁর আকুতি, “আমাদের কথা যেন সরকার শোনে, আপনারা তা লিখে দিন।”
শিশুদের চোখের হাসি: প্রকল্পটির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করা। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত আট বছরের সিরাজুল ইসলাম পেয়েছে চিকিৎসার সহায়তা। হুইলচেয়ারে বসে থাকা ১৩ বছরের প্রসন্ন ত্রিপুরা পেয়েছে চলাচলের স্বাধীনতা ও পুষ্টিকর খাবার। ছোট ছোট এই শিশুদের হাসিতে লুকিয়ে আছে তাদের পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের একাকিত্ব লাঘবের গল্প।
দয়া নয়, অধিকারের লড়াই : কারিতাস বাংলাদেশের বাস্তবায়নে এবং জার্মান সরকার ও বিএমজেড-এর সহায়তায় চলা এই প্রকল্পটি বর্তমানে ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সামাজিক অন্তর্ভুক্তি (এসডিডিবি ২০২৫-২০২৭)’ নামে তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। আলীকদমে গড়ে তোলা হয়েছে ‘হিতৈষী ক্লাব ঘর’, যা প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য হয়ে উঠেছে সাহসের ঠিকানা।
প্রকল্পের এনিমেটর মার্চেল্লো ত্রিপুরা জানান, এটি শুধু ব্যক্তিগত সহায়তা নয়, বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর একটি আন্দোলন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মাদকবিরোধী কর্মসূচি এবং ইউনিয়ন পরিষদে অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায়ের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তানভীর হোসেন বলেন, “কারিতাসের এই প্রকল্পটি এলাকায় অত্যন্ত ইতিবাচক কাজ করছে। তাদের মাধ্যমে অনেক প্রান্তিক মানুষ সরকারি দপ্তরের সেবা নিতে সাহসী হয়ে উঠছে। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী দিবসসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে তারা সরকারের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করছে, যা প্রশংসনীয়।” পাহাড়ের এই মেঘ-কুয়াশার জনপদে এসডিডিবি প্রকল্পটি কেবল একটি সহায়তা কর্মসূচী নয়, এটি মানবিক সমাজ গঠনের এক অনন্য উদাহরণ। যেখানে অন্তর্ভুক্তি আর দয়া নয়, বরং অধিকারই হয়ে উঠেছে মূল কথা।