মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোংলা

সুন্দরবনের নদী ও খালে কাঁকড়ার প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে কাঁকড়া আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। প্রতি বছরের মতো এবারও প্রজনন মৌসুমে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হলেও এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করা উপকূলীয় এলাকার হাজারো বনজীবী জেলে। আয় বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া ডিম ছাড়ার জন্য পানিতে নেমে আসে। এই সময় কাঁকড়া ধরা হলে শুধু প্রজাতির ক্ষতিই নয়, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে কারণেই প্রতিবছর এই দুই মাস কাঁকড়া আহরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রাখা হয়। তবে এই সময়ে বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান বা নিয়মিত সরকারি সহায়তা না থাকায় কাঁকড়াজীবী পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। একজন বৃদ্ধ কাঁকড়াজীবী বলেন, তাদের কষ্ট বোঝার মতো কেউ নেই। কাঁকড়া ধরেই সংসার চলে, পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। এখন কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকায় খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটাতে হচ্ছে।

আরেকজন তরুণ কাঁকড়াজীবী জানান, তিনি সাত থেকে আট বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। বছরে কয়েক মাস কাজ বন্ধ থাকায় এই সময়ের মধ্যে ঋণের বোঝা বাড়ে, খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। সমিতি থেকে ঋণ পাওয়া যায় না, আবার সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিয়মিত সহায়তা মেলে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। তার দাবি, সরকার যেন এমন ব্যবস্থা করে যাতে অন্তত নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। ফরহাদ নামের একজন কাঁকড়াজীবী জানান, তিনি প্রায় ১৬–১৭ বছর ধরে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরছেন, কিন্তু কখনো কোনো ধরনের সরকারি অনুদান পাননি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক সময় কর্মকর্তারা তথ্য সংগ্রহ করতে আসেন, কথা বলেন, কিন্তু পরে আর কোনো খোঁজ নেন না। নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আরেকজন বয়স্ক জেলে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাছ ও কাঁকড়া ধরলেও নিষেধাজ্ঞার সময় জেলা প্রশাসন বা অন্য কোনো দপ্তর থেকে সহায়তা পান না। কয়েক মাস কাজ বন্ধ থাকলে সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। খাদ্য সহায়তা বা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পরিবারকে অনাহারের ঝুঁকিতে থাকতে হয়।

অনেক জেলে জানান, কাঁকড়া ধরার জন্য আগে থেকেই নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামের পেছনে টাকা খরচ করতে হয়। অনেকেই সমিতি বা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিয়ে এই পেশায় যুক্ত থাকেন। নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ থাকলেও ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য দেনা পরিশোধের চাপ থেকেই যায়, যা পরিবারে বাড়তি সংকট তৈরি করে।

কাঁকড়াজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ পুরোপুরি বন্ধ থাকলে তারা অন্য কোনো কাজে সহজে যুক্ত হতে পারেন না। অধিকাংশ পরিবার পুরোপুরি এই পেশার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কয়েক মাস আয় না থাকলে সংসারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। পূর্ব সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে কাঁকড়া ডিম ছাড়ার জন্য পানিতে অবস্থান করে, তাই এই সময় কাঁকড়া ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞার সময় কোনো ধরনের পারমিট দেওয়া হয় না এবং কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম নিয়ে বনাঞ্চলে প্রবেশ করলেও বন আইনে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন বিভাগ এ বিষয়ে নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালাচ্ছে বলেও তিনি জানান।

তবে জেলেদের দুর্দশার বিষয়টি স্বীকার করে মৎস্য বিভাগ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। মোংলা উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, যারা শুধুমাত্র কাঁকড়া আহরণের ওপর নির্ভরশীল, নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং কাঁকড়াজীবীদের তালিকা হালনাগাদ করে বনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে খাদ্য সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়দের দাবি, মোংলা উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন হাজার কাঁকড়া জেলে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া সংরক্ষণের পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠেছে। তা না হলে পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার সংকট আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।