বোদা (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা : পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দন্ডপাল ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের কালীডাঙ্গা এলাকায় কৃষি ফসলি জমি থেকে দিন-রাত ভেকু (এক্সকাভেটর) ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও কৃষিজমি উভয়ই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরেজমিনে দন্ডপাল ইউনিয়নে দেখা যায়, হাওরের ফসলি জমি থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৪ ফুট গভীর করে টপ সয়েল কেটে নেওয়া হচ্ছে।
এসব মাটি দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ও ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে অনুমোদনবিহীন মাহিন্দ্রা ট্রলি ও ড্রাম ট্রাক অবাধে চলাচল করছে, যার ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ট্রলি ও ট্রাকে বহন করা মাটি সড়কের ওপর পড়ে থাকায় পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের চলাচলের কারণে সারাদিন রাস্তাঘাট ধুলোর কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বৃষ্টির সময় সড়কে জমে থাকা মাটি পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, মাটি ব্যবসায়ীরা নগদ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে অল্প দামে জমির মালিকদের কাছ থেকে ফসলি জমির মাটি কিনে নেয় এবং তা বিভিন্ন স্থানে ও ইটভাটায় বিক্রি করে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে মাটি কাটা বন্ধ হচ্ছে না।
এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ফসল উৎপাদন কমছে এবং ধীরে ধীরে দেবীগঞ্জ উপজেলার ভৌগোলিক চিত্রও পরিবর্তিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ফসলি জমি কেটে পুকুর তৈরি করা হচ্ছে এবং সেই মাটি বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। জমির মালিক দিনরঞ্জন রায় বলেন, নিজেদের প্রয়োজনেই আমরা জমি থেকে মাটি কাটছি। কৃষিজমি কেটে পুকুর খনন করছি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় ইটভাটাগুলো কৃষিজমির টপ সয়েল তুলে নিচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদ বলেন, ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ফেললে জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। টপ সয়েল হলো মাটির সবচেয়ে উর্বর স্তর, যা জৈব ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। সাধারণত মাটির ওপরের ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত এই স্তর থাকে। এটি ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টপ সয়েল নষ্ট হলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর সময় লাগে। তিনি আরও জানান, কৃষকদের টপ সয়েল না কাটতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, ভেকু দিয়ে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার বিষয়ে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবৈধভাবে মাটি কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এপ্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মোঃ সায়েমুজ্জামান জানান, কৃষিজমির মাটি কাটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুরাদনগরে কৃষিজমির টপ সয়েল প্রতিকার পাচ্ছে না কৃষকরা
মুরাদনগর (কুমিল্লা) সংবাদদাতা : মুরাদনগর উপজেলানবীপুর পূর্ব ইউনিয়নের গুঞ্জুর বিলে আইন অমান্য করে কৃষিজমির মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছে। ভেকু দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়ায় পাশের জমিগুলো ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর প্রতিকার মেলেনি। ফলে বিলের শত শত একর ফসলি জমি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গকুলনগর গ্রামের জামাল মিয়ার ছেলে প্রবাসী হেলাল মিয়া তার জমির মাটি বিক্রি করেছেন একই গ্রামের মালু মিয়ার ছেলে আল-আমিন ও বাখরনগর গ্রামের মালেক মিয়ার ছেলে প্রবাসী মাহবুবের কাছে। চক্রটি দিনের বেলায় ভেকু মেশিন পাশের জমিতে লুকিয়ে রাখে এবং রাত গভীর হলে মাটি কাটার কাজ শুরু করে। বর্তমানে তারা পুকুরের পাড় বাঁধার নাম করে মাটি কাটলেও মূলত গভীর গর্ত করে কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও মাটি লুটের পরিকল্পনা করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ফসলি জমি থেকে অপরিকল্পিত ভাবে মাটি কেটে নেওয়ায় পাশের সুস্থ জমিগুলো ভারসাম্য হারিয়ে বিলীন হতে চলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানায়, তারা বারবার বাধা দিলেও প্রভাবশালী এই চক্রটি কারও তোয়াক্কা করছে না।
বরং রাতের অন্ধকারে দ্রুতগতিতে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ করলে তিনি প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেন। গত ২ সপ্তাহ ধরে এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী কৃষকরা বিষয়টির ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কাটা বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা দ-নীয় অপরাধ। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় গুঞ্জুর বিলে দীর্ঘ সময় ধরে এই অবৈধ কর্মকা- চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দ্রুত এই মাটি কাটা বন্ধ করা না হলে গুঞ্জুর বিলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।