গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা : ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নেমে পড়েন কৃষক আব্দুল মালেক। প্রতিদিনের মতোই আজও তাঁর প্রথম কাজ বীজতলার দিকে তাকানো। কিন্তু সবুজ চারা দেখে স্বস্তি পাওয়ার বদলে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কুয়াশার ভেজা ছোঁয়ায় চারা যেন প্রাণহীন—কোথাও হলদে, কোথাও আবার সাদা হয়ে গেছে। মালেকের কণ্ঠে হতাশা, “এই চারা বাঁচলে বাঁচবো আমরা, না বাঁচলে কী করবো?”
চাপাইনবাবগঞ্জজুড়ে এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। টানা ঘন কুয়াশা জেলার বোরো ধানের বীজতলাগুলোকে ঢেকে ফেলেছে অনিশ্চয়তার চাদরে। মাঠে মাঠে কৃষকের চোখে উৎকণ্ঠা, মুখে নিরব হিসাব—আর কতটা ক্ষতি হলে তারা সামাল দিতে পারবেন?
জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর জন্য ইতোমধ্যে ৮ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কুয়াশার প্রভাবে এসব বীজতলার বড় অংশই ঝুঁকিতে পড়েছে।
সদর উপজেলার কৃষক আমিনুল ইসলামের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ, “সার, বীজ, শ্রম—সব মিলিয়ে যা খরচ হয়েছে, সেটা উঠে আসবে কি না জানি না। নিজের চারা নষ্ট হলে বাইরে থেকে কিনতে হবে। তখন ঋণ ছাড়া উপায় থাকবে না।”
তার চোখে-মুখে স্পষ্ট একটাই ভয়—ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে ওঠা।
শিবগঞ্জের মাঠে দেখা যায় আরেক কৃষক তাজুল ইসলামকে। বীজতলার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “সময়মতো চারা না পেলে জমিতে রোপণ পিছিয়ে যাবে। বোরো দেরি হলে ফলনও কমে যায়। আমরা প্রকৃতির হাতে বন্দি।”
কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছেন—অতিরিক্ত পানি না রাখা, কুয়াশার সময় যতœ বাড়ানো। তবু কৃষকেরা জানেন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে প্রকৃতির ইচ্ছাই শেষ কথা। ঘন কুয়াশার এই দিনগুলো শুধু আবহাওয়ার সংকট নয়, এটি গ্রামবাংলার হাজারো পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার নাম। যে বীজতলায় আজ চারা কাঁপছে, সেখানেই লুকিয়ে আছে কৃষকের এক বছরের আশা, সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের ভরসা। কুয়াশা একদিন কেটে যাবে—এই আশাতেই আজও ভোরে মাঠে নামেন চাপাইনবাবগঞ্জের কৃষকরা। তারা জানেন, মাটির সঙ্গে লড়াই করাই তাদের নিয়তি, আর সেই লড়াইয়ে হার মানার সুযোগ নেই।