আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনায় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। মহানগরীর শিববাড়ী মোড়ে যৌথ বাহিনীর মহড়া, ভোটকেন্দ্রে সরঞ্জাম বিতরণ, বিভাগীয় পর্যায়ে কোর কমিটির বৈঠক সব মিলিয়ে প্রস্তুতির বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, এবারের প্রস্তুতি বিগত নির্বাচনগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রমী এবং লক্ষ্য একটাই ভোটারদের জন্য ভীতিহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার জানিয়েছেন, ছয়টি আসনে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,১০০ সেনাসদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি ২,৬০০ পুলিশ সদস্য, রাগাব, বিজিবি, নৌবাহিনী, আনসার ব্যাটালিয়ন ও সশস্ত্র আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথমবারের মতো প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে একজন আনসার সদস্যকে সরাসরি নিরাপত্তা সহায়তায় রাখা হয়েছে। পুলিশের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের কথাও জানানো হয়েছে, যা জেলা পর্যায়ে মনিটর করা যাবে।

প্রশাসনের দাবি, কোনো কেন্দ্রে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে। ৪০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন এবং ১৪ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সার্বিক প্রক্রিয়া মনিটর করবেন। কর্মকর্তারা বলছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হয়েছে এবং যৌথ মহড়া তারই অংশ।

তবে নিরাপত্তা প্রস্তুতির এই প্রদর্শনের মধ্যেই কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। খুলনা শহরে সাম্প্রতিক একটি খুনের ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, সেটি নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তবু ভোটের প্রাক্কালে এমন ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী সহিংসতা কেবল ভোটের দিন নয়, তার আগে-পরে সময়েও ঘটতে পারে তাই প্রতিরোধমূলক কৌশলই আসল পরীক্ষা।

নজরদারির অংশ হিসেবে খুলনায় ৫৫৮টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তবে এগুলো আইপি ক্যামেরা নয় লাইভ মনিটরিংয়ের সুযোগ নেই। অভিযোগ এলে পরবর্তীতে রেকর্ড যাচাই করা যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের বডি ক্যামেরা লাইভ মনিটরিং করা সম্ভব হলেও কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা মূলত প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য। বিশ্লেষকদের মতে, লাইভ নজরদারি না থাকলে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ সীমিত হতে পারে।

উপকূলীয় উপজেলা দাকোপ, বটিয়াঘাটা, কয়রা ও পাইকগাছা এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেখানে সড়ক যোগাযোগ নেই, সেখানে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোখতার আহমেদ জানান, ডিসিদের সঙ্গে নিয়মিত জুম মিটিং এবং কোর কমিটির বৈঠকে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ডিআইজি, নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরালসহ সংশ্লিষ্টরা এসব বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। অভিযোগ পেলে তা ইলেকশন ইনকোয়ারি কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম বিতরণও শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে খুলনা-১, ২, ৪,৫৩৬ আসনের জন্য ব্যালট পেপার, আমোচনীয় কালি ও অন্যান্য সামগ্রী বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। উপকূল ও দুর্গম এলাকায় আগেভাগে সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে, যাতে যোগাযোগ জটিলতায় বিলম্ব না হয়। খুলনা-২ ও ৩ আসনের কেন্দ্রগুলোতে সার্কিট হাউস থেকে মাইক্রোবাসযোগে উপকরণ পাঠানো হয়েছে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় থেকে মোটরসাইকেলসহ চার ধরনের যানবাহন বন্ধ রয়েছে। তবে ভোটারদের যাতায়াতে রিকশা, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নেই বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে ভোটের উৎসবে শামিল হতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরেছেন খুলনার মানুষ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোট উৎসবে শামিল হতে কর্মস্থল ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় ছুটে এসেছেন মানুষ। মঙ্গলবার সকাল থেকেই খুলনার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সোনাডাঙ্গা থেকে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, শরণখোলা, শ্যামনগর, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীদের বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা যায়। ভোটের দিন পরিবহন বন্ধ থাকতে পারে- এমন আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগেই রওনা হন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে যাত্রীচাপ বেশি দেখা যায়। সড়কপথের পাশাপাশি খুলনার ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এবং নতুন বাজার লঞ্চঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন নৌরুটে নৌরুটের লঞ্চেও যাত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের বলেন, ভোটের দিনও পাবলিক পরিবহন স্বাভাবিক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভোটকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ বজায় থাকে। তিনি বলেন, "শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পরিবহন ও মোটরসাইকেলসহ নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে।" সোনাডাঙ্গা এলাকায় ব্যবসা করেন মো. নাসির শেখ। মঙ্গলবার বিকেলে গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের রামপালের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ভোট দিয়ে পরদিনই আবার খুলনায় ফিরে আসবেন।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাঁও এলাকার মাহবুবুর রহমান জানান, বুধবার সকাল ১০টায় একটি রিজার্ভ বাস মোরেলগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। যাতে করে এলাকার সকলে একসঙ্গে চলে যান।

অন্যদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দা মিলন, যিনি ঢাকায় রাইডশেয়ারিং সেবা চালান, মঙ্গলবার বিকেলে পরিবহনযোগে খুলনায় পৌঁছান। তিনি জানান, বুধবার গ্রামে তিনি চলে গেছেন। এভাবে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে কর্মজীবী মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফিওে এসেছেন ভোট দিতে। দীর্ঘদিন পর ভোটকে উৎসব হিসেবে নিতেই মানুষের এই আগ্রহ ও ছুটে চলা- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।