সাড়ে চার বছর আগে খুলনার দিঘলিয়ার দেয়াড়া দেবনগর গ্রাম থেকে চার সদস্যের ঋণগ্রস্ত পরিবারটি ঢাকার ইস্কাটন এলাকায় আসে। গৃহকর্তা আলী আকবর মজুমদার রিকশা চালানো শুরু করেন। তাঁর স্ত্রী সিজু বেগম বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ নেন। আর তাঁদের দুই সন্তান সিয়াম মজুমদার ও সেজান মজুমদার ইস্কাটন এলাকাতেই দুটি মোটরপার্টস ডেকোরেশনের দোকানে কাজ নেন। পরিবারের সবাই মিলে চেষ্টা করছিলেন ঋণমুক্ত হওয়ার। তা আর হলোনা, বিধিবাম। বুধবার সন্ধ্যার পর নিউ ইস্কাটনে ফ্লাইওভার থেকে ছোড়া ককটেলের বিস্ফোরণে আলী আকবর ও সিজু বেগম দম্পতির বড় ছেলে সিয়ামের মৃত্যুতে অসহায় পরিবারটি যেন আরও অসহায় হয়ে পড়েছে।
এদিকে, ওই ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার হাতিরঝিল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন সিয়ামের বাবা আলী আকবর মজুমদার। তবে ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মর্তুজা বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পুলিশের সাথে অন্যান্য সংস্থাও কাজ করছে।
গতকাল ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ১০ মিনিটের সময় রাজধানীর মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীদের ছোড়া বিস্ফোরক দ্রব্যের আঘাতে সিয়াম মজুমদার (২১) নামে এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। নিহত সিয়াম স্থানীয় একটি মোটরকার ডেকোরেশন দোকানে কাজ করেন এবং ঘটনার সময় তিনি মগবাজার-নিউ ইস্কাটন রোডস্থ কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়, ঘটনাটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক ককটেল সন্ত্রাসেরই অংশ, যার উদ্দেশ্য জনমনে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ানো। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে নিকটস্থ থানা অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে অবহিত করার জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ করা হলো।
গতকাল দুপুরে ইস্কাটনের দুই হাজার গলিতে সিয়ামদের ভাড়া বাসায় তার মা সিজু বেগম উপস্থিত সংবাদ কর্মীদের সামনে বিলাপ করছিলেন, আর শুধু বলছিলেন, আমি আর ঢাকায় থাকমু না। ঢাকায় আইস্যা সব শেষ হইয়্যা গেল। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সিজু বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, আমনেগোর কাছে আমি সূক্ষ্ম বিচার (সুষ্ঠু বিচার) চাই। এই দেশে কেউ সূক্ষ্ম বিচার (সুষ্ঠু বিচার) করে না। আমি বলব, এই সরকার যেন হত্যাকারীদের বের করে বিচার করে। আমি এই বিচার চাই।
সিয়ামের ছোট ভাই সেজান মজুমদার বলেন, জীবিকার সন্ধানে তাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন। পরিবারের ঋণ পরিশোধের পর দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন সিয়াম। ভাইয়ের মৃত্যুতে তিনিসহ পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।
সিয়ামের বাবা আলী আকবর মজুমদার বলেন, ভাগ্য ফেরাতে ঢাকায় এসে ছেলেকে হারাতে হবে, এমন জানলে তিনি কখনোই ঢাকায় আসতেন না।
ঘটনাস্থলে থাকা চা-দোকানি মো. ফারুক বলেন, ছেলেটা আমার কাছে এসে চা চেয়েছিল। আমি চা বানাচ্ছিলাম। এর মধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দ। দেখি ছেলেটা মাটিতে পড়ে আছে। মাথা থেকে রক্ত পড়ছিল। ফ্লাইওভার থেকে ককটেল বা বোমা হয়তো ওর মাথায় পড়েছে।