টানা অচলাবস্থার পর চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান ধর্মঘট এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে আন্দোলনকারী সংগঠন ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’। সংগঠনটির পক্ষ থেকে মধ্যরাতে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে গতকাল সোমবার সকাল থেকে বন্দরের কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিক হয়ে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার কোনো চুক্তি হবে না-বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকনের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পবিত্র রমযানকে সামনে রেখে পণ্য খালাস স্বাভাবিক রাখতে সোমবার সকাল ৮টা থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখা হবে। তবে বন্দর কর্মচারীদের গ্রেফতার, হয়রানিমূলক বদলি ও সাময়িক বরখাস্তসহ পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে পুনরায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহজুড়ে দফায় দফায় কর্মবিরতির কর্মসূচির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ গত রোববার সকাল ৮টা থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করে সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিস্থিতিতে রোববার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডস্থ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, বর্তমান সরকারের মেয়াদে এনসিটি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার কোনো চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
উল্লেখ্য, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন দিন কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন শেষে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি শুরু হয়। এতে বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং জাহাজ চলাচলও স্থগিত হয়ে পড়ে।
এই অচলাবস্থার মধ্যেই ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে গেলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। আন্দোলনকারীরা তার গাড়ি আটকে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
পরবর্তীতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বন্দর ভবনে প্রবেশ করে নৌ উপদেষ্টা বন্দর কর্তৃপক্ষ, আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল-এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল, বদলি আদেশ প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি বন্ধ এবং বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার।
সংগ্রাম পরিষদের দাবি, বৈঠকে নৌ উপদেষ্টা বদলি ও মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে আশ্বাস দেন এবং বাকি দাবিগুলো সরকারের উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপনের কথা জানান। তবে চুক্তি বাতিলের দাবির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে জানান, বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত করার কোনো চেষ্টা হলে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।
এরপর আন্দোলনকারীরা ৪৮ ঘণ্টার জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করে এবং ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দেন। তবে দাবি বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট ঘোষণা না এলে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুনরায় কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে আবারও লাগাতার ধর্মঘট শুরু হয়।
এরই মধ্যে আন্দোলন চলাকালে সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়কসহ ১৫ কর্মচারীকে বদলি করা হয়। তবে তারা কেউই নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। একই সময়ে ওই ১৫ কর্মচারীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি এবং তাদের সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে চিঠি পাঠানো হয়, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে।
সর্বশেষ ধর্মঘট কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ পাঁচ কর্মচারীকে আটক করে। পাশাপাশি বদলি হওয়া ১৫ কর্মচারীর সরকারি বাসার বরাদ্দও বাতিল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।