মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ বেনাপোল-খুলনা-মোংলা (যশোর হয়ে) রুটে চলাচলকারী বেনাপোল কমিউটার তথা মোংলা কমিউটার (৯৫/৯৬) ট্রেনটি অবশেষে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও সরকারি তত্ত্বাবধান থেকে ট্রেনটির টিকিট ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিয়মিত যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

গতকাল রোববার থেকে রেলওয়ের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’। যাত্রীদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে ভাড়া বৃদ্ধি, ভিড় বৃদ্ধি এবং টিকিট নিয়ে হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে। তাদের দাবি, ট্রেনটি সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই রাখা হলে সেবার মান ও স্বচ্ছতা আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব।

রেল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ট্রেনটি বেসরকারি খাতে লিজ দিলে বর্তমান আয়ের চেয়ে বেশি রাজস্ব পাওয়া যাবে—এই যুক্তিতে কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। তবে যাত্রীদের মতে, স্টেশনে পর্যাপ্ত চেকার নিয়োগ এবং টিকিট ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বাড়ালে সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই আরও বেশি আয় করা সম্ভব ছিল। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে টিকিট কালোবাজারি, অতিরিক্ত ভিড় এবং শৃঙ্খলাজনিত সমস্যার আশঙ্কাও বাড়বে বলে মনে করেন তারা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ট্রেনটির বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৯ মে দরপত্র খোলা হয় এবং জুনের প্রথম সপ্তাহে যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি রেলের মূল্যায়ন কমিটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তী যাচাই শেষে তিন বছরের জন্য ‘এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’-কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যাত্রীদের অভিযোগ, সম্ভাব্য আন্দোলন এড়াতে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটাই নীরবে সম্পন্ন করা হয়েছে।

খুলনা-যশোর-বেনাপোল রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ২৩ নভেম্বর। প্রথম ১১ বছর ট্রেনটি সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার সময় যাত্রীসেবার মান অবনতি ঘটে এবং চোরাচালান ও অবৈধ দখলের অভিযোগ ওঠে। এসব কারণে ২০১৩ সালে পুনরায় ট্রেনটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরে আসে। এরপর যাত্রীসংখ্যা ও রাজস্ব উভয়ই বৃদ্ধি পায়।

২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে যাত্রীচাহিদা ও লাভজনকতা বিবেচনায় দিনে দুইবার ট্রেন চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে। বর্তমানে এই ট্রেন থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে রেল সূত্রে জানা গেছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এ কারণে ব্যবসায়িক সুযোগ সন্ধানীদের দৃষ্টি এই রুটের প্রতি পড়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।

অন্যদিকে, মোংলা-খুলনা-যশোর-বেনাপোল রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয় বন্দর প্রতিষ্ঠার প্রায় ৭৩ বছর পর ২০২৪ সালের ১ জুন। বর্তমানে শুধুমাত্র একটি যাত্রীবাহী ট্রেন—‘মোংলা কমিউটার (৯৫/৯৬)’, মোংলা থেকে বেনাপোল রুটে চলাচল করছে। একমাত্র এই ট্রেনটিও আবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ায় যাত্রীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

যাত্রীদের আরও অভিযোগ, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে বগির সংখ্যা কমে যেতে পারে, ফলে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি করে যাতায়াত করতে হবে। এতে বিশেষ করে পাসপোর্টধারী যাত্রী ও নারী যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত টিকিট চেকিং না থাকলে রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ যাত্রী পরিবহনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

নিয়মিত যাত্রী সাইফুল ইসলাম সাঈদ বলেন, খুলনা থেকে বেনাপোল বাসে যেতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা এবং ভাড়া প্রায় ২৫০ টাকা। অথচ কমিউটার ট্রেনে একই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা এবং ভাড়া মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। কম খরচ ও স্বল্প সময়ে যাতায়াতের কারণে সাধা

ণ যাত্রী ও ভারতগামী যাত্রীদের কাছে এই ট্রেনটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। তার মতে, বর্তমানে সরকার আগের তুলনায় বেশি আয় করছে, তাই এ ট্রেনটি বেসরকারি খাতে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

আরেক যাত্রী মাহমুদুল হাসান নাবিল বলেন, ট্রেনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন এবং আগের মতো চোরাচালানকারীদের আধিপত্য ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি ট্রেনটি সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই রাখার জন্য রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।