ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরবর্তী সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, অগ্নিসংযোগ, খুন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ অভিযোগ বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। শাপলাকলিতে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

নাটোরের বড়াইগ্রাাম ও গুরুদাসপুরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ইউনিয়ন জামায়াতের আমীরসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ১১টি বাড়ি ও একটি দোকান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার নগর ইউনিয়নের ধানাইদহ এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত নগর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর হাসিনুর রহমানকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আসাব সরকারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, পুলিশ সুপার আব্দুল ওহাব, ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস, সেনা কমান্ডার ক্যাপটেন আরাফাত রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার বিকেলে ধানাইদহ বাজারে জামায়াত কর্মী সাব্বির হোসেনকে মারপিট করে বিএনপির কর্মীরা। এরই জের ধরে শনিবার বিষয়টি সুরাহা করতে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে স্থানীয় বিএনপির নেতা ফয়সাল ও ফাইমের নেতৃত্বে মিঠু, হুসাইন, বিপ্লব, সুমন, রেন্টু, পাসা, আরমান সহ আরো ১০-১২ জন। জামায়াতের নেতা কর্মীদের উপর হামলা শুরু করলে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই দলের নেতা-কর্মীরা। এতে হাসিনুর রহমানসহ অন্তত ৭-১০ জন আহত হয়। বিএনপি কর্মীরা একাধিক ফাঁকা গুলি বর্ষণ করলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে বিএনপি কর্মীরা জামায়াত কর্মী ধানাইদহ গ্রামের সানোয়ার হোসেন, ইব্রাহিম আলী, আব্দুস সোবাহান, নবীন আহম্মেদ, সিরাজুল ইসলাম, আল আমীন হোসেন ও মোজাম্মেল হোসেনের বাড়ি এবং ধানাইদহ বাজারে একটি দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছেন। পুলিশ ও এলাকাবাসীরা আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

বাগেরহাট সংবাদদাতা জানান, বাগেরহাটে ভোট শেষে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৯০ আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এক সমর্থক। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

ভোটের আগে থেকেই বাগেরহাট সদর ও কচুয়া এলাকায় বিএনপি, জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। ভোট পরবর্তী যা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী দুই দিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ৩০টি সংঘাতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সবশেষ শনিবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের আরপাড়া এলাকায় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নারীসহ অন্তত ৩০ জন রক্তাক্ত জখম হয়েছে।

এদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার পারনওয়াপাড়া ও কচুয়া উপজেলার ছিটাবাড়ি এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএএইচ সেলিমের ও বিএনপির প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর (ঘোড়া প্রতীক) সমর্থক ওসমান সরদার নামের এক যুবক খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

নিহত ওসমান সরদার বাগেরহাট সদর উপজেলার পাড়নওয়াপাড়া গ্রামের শাহজাহান সরদারের ছেলে।

বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শামীম হোসেন বলেন, একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের পুলিশ শনাক্ত করেছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে। মামলার প্রক্রিয়া চলমান।

সদর উপজেলায় চুনখোলা, মান্দ্রা, চুলকাঠিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় নারীসহ ১৫ জন আহত হয়েছে।

বাগেহাটের পুলিশ সুপার মো. হাসান চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতায় পরিস্থিতি শান্ত আছে। নিজের কর্মীদের শান্ত রাখার জন্য সকল প্রার্থীর সাথেও আমরা কথা বলেছি। অপরাধীদের কোন ছাড় নেই। প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

নোয়াখালীতে শাপলাকলি প্রতীকে ভোট দেয়ায় ৩ সন্তানের জননীকে ধর্ষণের অভিযোগ

নোয়াখালী সংবাদদাতা : নোয়াখালীর হাতিয়ায় ভোটের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতীক ‘শাপলা কলি’তে ভোট দেওয়ার অপরাধে স্বামীকে বেঁধে রেখে তিন সন্তানের জননীকে (৩২) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে।

রাত ১১টার দিকে চানন্দি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে এ ঘটনা ঘটে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ভুক্তভোগীকে ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে থানা-পুলিশকে জানানো হয়েছে।

নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে বিজয়ী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, “গত তিন দিনে এ ধরনের ধর্ষণের অহরহ ঘটনা ঘটেছে দ্বীপ হাতিয়ায়। তারা (বিএনপি) তাণ্ডব চালাচ্ছে। আমার ৫০০ নেতাকর্মীর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা : চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে ২ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়েছে। নিহত আলামিন (২০) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রাণীহাটি ইউনিয়নের উপরধুমিহায়াতপুরের মোয়াজ্জেমের ছেলে। আহতরা হলো-চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে বজলুর রহমান (২০), জেনারুল ইসলামের ছেলে মিনহাজ (২২) ও একই উপজেলার রানীহাটি ইউনিয়নের উপরধুমি এলাকার রফিজুল ইসলামের ছেলে শুভ (২০)। গতকাল শনিবার ভোর ৫টার দিকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া এলাকার এক বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এসময় বাড়ির দেওয়ালের এক অংশ ভেঙ্গে পড়ে এবং টিনের চালাও উড়ে গেছে। এদিকে, বেলা সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান পিপিএম বার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস।

তাড়াশে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নারীসহ আহত ৭

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : সিরাজগঞ্জের তাড়াশে নির্বাচন পরবর্তী বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নারীসহ সাতজন আহত হয়েছেন। গতকার শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের গুড়মা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন—সিয়াম হোসেন (১৩), সুলতান মাহমুদ (৩২), সবুরা খাতুন (২৬), রহিম হোসেন (৩০), আব্দুল গফুর (৩২), মোছা. মোস্তারিন পারভীন (৩০) ও রেহেনা খাতুন (২০)। আহতদের প্রথমে তাড়াশ ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে পাঁচজনকে সিরাজগঞ্জ শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা : চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরবর্তী বিএনপির সহিংতায় বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের অফিস ও নেতাকর্মীদের বাড়ি ও দোকানে হামলার প্রতিবাদে প্রেস ব্রিফিং করেছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। শনিবার দুপুর ১২ টার সময় আলমডাঙ্গা পৌর জামায়াতের কার্যালয়ে এ প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়।

এ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে চুয়াডাঙ্গা এবং আলমডাঙ্গার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে সহিংস ঘটনাগুলো ঘটছে।

জামালপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপির হামলা

জামালপুর সংবাদদাতা : জামালপুরে জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীদের ওপর ও বাসা বাড়িতে হামলা চালিয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ ব্যাপারে জামায়াতের জেলা আমীর মাওঃ মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার ও সেক্রেটারী এড. আব্দুল আওয়াল তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির নেতা কর্মীরা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও জামালপুর সদর উপজেলায় কমপক্ষে ৫০ জন জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, বাসা বাড়ী ভাংচুর ও দোকান খুলতে বাধা প্রদান করে আসছে। প্রকাশ্য দিবালোকে জামায়াতের নেতা কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জামালপুর সদরের শুকুর মাহমুদ (৫০) নামে এক জামায়াত নেতাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে বিএনপির কর্মীরা। বর্তমানে তিনি জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।

নরসিংদী সংবাদদাতা : নরসিংদীর মাধবদীতে বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী ব্যানার অপসারণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

গত শুক্রবার রাতে মাধবদী থানার কাঁঠালিয়া ইউনিয়নের ডৌকাদি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে নরসিংদী আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামীমের নেতৃত্বে পুলিশ, র‌্যাবের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী ঐ এলাকায় রাতভর অভিযান পরিচালনা করে সংঘর্ষে জড়িত দুই পক্ষের ১১ জনকে গ্রেফতার করে।