নতুন করে প্রকোপ শুরু হওয়া হামের চিকিৎসার জন্য খুলনায় একমাত্র প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। মাত্র ১৪টি বেড নিয়ে আইসোলেশন করে চিকিৎসা শুরু করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগীর চাপ বাড়তে থাকলেও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারে এখন আর নতুন রোগী ভর্তি নেওয়ার মতো বেড নেই। অন্যদিকে নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় বছর পার হলেও হলেও কার্যক্রম শুরু না করে ফেলে রাখা হয়েছে খুলনার বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল। ফলে চিকিৎসা সেবার অভাবে অনেক শিশু রোগীকে ভর্তি না করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে জানা যায়, বুধবার সকাল পর্যন্ত খুলনা বিভাগে হাম নিয়ে ভর্তি আছে ১৫৪ জন শিশু। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারে আছে ১৫জন। যদিও এখানে বেডের সংখ্যা মাত্র ১৪টি। এছাড়া সব থেকে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ ৮৩ জন, যশোরে ২৭ জন, খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫ জন, ঝিনাইদহে ৭ জন, সাতক্ষীরায় ৭ জন, মাগুরায় ৬ জন, নড়াইলে ৪ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৩ জন, খুলনা জেলায় ১ জন ও মেহেরপুরে ১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
প্রকোপ শুরু হওয়া হামের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালটির আইসিইউ ভবনের নিচতলায় একটি ওয়ার্ড খুলে সেখানে ১৪টি বেড দিয়ে আইসোলেশন সেন্টার খুলে সেখানে দেয়া হচ্ছে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায়। তবে জরুরী বিভাগে সার্বক্ষণিক অবাধে মানুষের জাতায়াত থাকায় এখানে আইসোলেশন সেন্টারের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। চিকিৎসা শুরু হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় ১৪টি বেড পূর্ণ হয়েছে। বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে ১৫টি শিশু ভর্তি ছিল। এর পরে আর একটা রোগী আসলে এক বেডে একাধিক রোগী রাখতে বাধ্য হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, এমনিতে আমাদের শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ৪০টি বেডের বিপরীতে ২ শতাধিক শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। সব মিলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৫শ’ এর বেশি। এছাড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংক্রমক রোগীদের ভর্তিও কোন সুযোগ নাই। কিন্তু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা পূর্বের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৪টি বেডে আইসোলেশন সেন্টার খুলে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করতেছি। কিন্তু তা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন আর একটা রোগী আসলে আমরা কিভাবে ভর্তি করবো কিছু বুঝতে পারতেছি না। ফেরত দেবো কি না কোথায় রাখবো কিছু বুঝতে পারতেছি না। হাসাপাতালের মুল ভবনে আনতেও পারতেছি না। হ্যাঁ অতি মাত্রায় সংক্রমক হওয়ায় খুবই ঝুকিতে রয়েছে সাধারণ অন্যান্য রোগীরা।
খুলনার একমাত্র বেসরকারি শিশু হাসপাতালে বর্তমানে ২৬৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। ২৫০ শয্যার বিপরীতে কেবিনসহ সবকিছু পূর্ণ রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের মূল ফটকে কোনো ধরনের সিট খালিনাই সাইনবোর্ড ঝুলছে। অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে প্রতিদিন রোগী ভর্তি করা হয়। কিন্তু হামের উপসর্গ থাকলেই সেই শিশুদের ভর্তি না করে রেফার করে দেওয়া হচ্ছে। খুলনা জেলা প্রশাসন এবং শিশু ফাউন্ডেশন মাধ্যমে পরিচালিত এই হাসপাতালটি জায়গার অভাবে শিশুদের অনেক বিশেষ রোগের কোন সেবা দিতে পারছেনা।
খুলনা শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রদিপ দেবনাথ বলেন, আমাদের অল্প জায়গার মধ্যে আমরা ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চালাই। কিন্তু আমাদের কেবিনসহ সার্বক্ষণিক অনেক বেশি রোগী থাকে। সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি থাকায় আমরা কোনোভাবে হাম রোগীদের জায়গা দিতে পারছি না। সর্বত্র অন্যান্য রোগে শিশু ভর্তি রয়েছে। এই হাসপাতালটির জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, স্বায়ত্তশাসন বা সরকারি করণ হলে এখান থেকেই খুলনার শিশু রোগ চিকিৎসায় নতুন যুগের সুচনা করা সম্ভব হতো।
শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রসারের লক্ষ্যে প্রায় এক বছর আগে সম্পন্ন হয়েছে খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালের নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এখনো হস্তান্তর হয়নি ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতাল। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগও হয়নি। ভবন নির্মাণ করে এখন দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউই। একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতল এবং খুলনার সিভিল সার্জনকে এ ভবনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য চিঠি দিলেও কেউ তাতে কর্ণপাত করেনি। ফলে কবে এ সংকটের সমাধান হবে এবং হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট র্কর্তৃপক্ষ।
গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন মেলে। বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগর ও ডুমুরিয়ার চকমথুরাবাদ মৌজার সংযোগস্থলে, অর্থাৎ কেডিএর ময়ূরী আবাসিক এলাকার বিপরীতে জমি চূড়ান্ত করা হয়। ২০১৯ সালে জেলা প্রশাসন ৫২ কোটি টাকায় ৪ দশমিক ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে গণপূর্ত বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। গণপূর্ত বিভাগ ২০২০ সালে প্রথমপর্যায়ে হাসপাতালের বেজমেন্ট ও একতলা ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। টেন্ডারে নির্বাচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রৈতি এন্টারপ্রাইজ ২০২০ সালের ১৪ মে কার্যাদেশ পায়। ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এই কাজের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, সংশোধিত প্রস্তাবনায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের অনুমোদন মেলে। এতে রান্নাঘর, সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ, সীমানাপ্রাচীর, রাস্তা, ড্রেন ও ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের কাজও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ কাজের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুন মাসে। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কোনো কাজই নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয়নি। বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে কাগজে-কলমে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত দেখানো হয়।
গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে দরপত্র আহ্বানেও দেরি হয়। কাজ শুরুর পর প্রবেশপথ নিয়ে জটিলতায় কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর নির্মাণকাজ বুঝে নিতে খুলনা সিভিল সার্জনকে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।’
খুলনা সিভিল সার্জন ডা. মাহফুজা খাতুন চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ দেখানো হলেও হাসপাতালের একপাশে প্রাচীর ও প্রধান ফটকে গেট নেই। ফলে হাসপাতালটি অরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া কার্যক্রম শুরুর জন্য আসবাবপত্র ও জনবলের ব্যবস্থা নেই। গণপূর্তের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।