গাইবান্ধা সংবাদদাতা : শীত এলেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার খেজুর গুড়ের কদর বেড়ে যায়। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে খেজুর গাছ থেকে ঝরেপড়া রস আর তা দিয়ে তৈরি গুড় এই স্বাদ ও ঘ্রাণে মুগ্ধ হয় সব বয়সী মানুষ। কিন্ত গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলায় চলতি শীত মৌসুমে সেই ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়ই এখন রূপ নিয়েছে নীরব ঘাতকে।

ভেজাল গুড়ে সয়লাব বাজার গাইবান্ধা শহরের হকার্স মার্কেট, নতুন বাজার, পুরাতন বাজার, খানকা শরীফ, বাংলা বাজার, সুখনগর বাজারসহ অলিগলির দোকান, ফুটপাত ও বিভিন্ন হাটবাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ও কেমিক্যালযুক্ত খেজুর গুড়। বিশেষ করে গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্ল্যাপুর উপজেলার হাটগুলো ধাপেরহাট, তারাপুর ভাতগাম, মিরপুর নলডাঙার হাট, জামালহাট, কাটগড়া হাট, লক্ষ্মীপুরহাট, দাড়িয়াপুরহাট, পাঁচপীর হাট, ধুপনী হাট, একাডেমি বাজারসহ প্রায় সব বাজারেই নকল গুড়ের রমরমা বাণিজ্য চলছে।

কী দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই গুড়? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খেজুরের রস ছাড়াই আধুনিক কেমিক্যাল, চিনি, গ্লুকোজ, রং ও বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করে গুড় তৈরি করছেন। কেমিক্যালের মাধ্যমে গুড়কে করা হচ্ছে অতিরিক্ত মসৃণ, চকচকে ও আকর্ষণীয় রঙিন যা সাধারণ ক্রেতার চোখে ধরা পড়ে না।

ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতা এ বিষয়ে কথা হলে চিকিৎসক ডা. আশরাফ আলী বলেন, ভেজাল ও কেমিক্যালযুক্ত খেজুর গুড় খেলে কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘদিন এসব গুড় গ্রহণ করলে লিভার সিরোসিস, পাকস্থলীর আলসার, হজমজনিত জটিলতা এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

তিনি আরও জানান, এসব গুড়ে ব্যবহৃত কেমিক্যাল শরীরে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী রোগে রূপ নিতে পারে।

প্রশাসনের নীরবতা, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কোথায়? সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এত বড় আকারে ভেজাল গুড়ের ব্যবসা চললেও প্রশাসন কিংবা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকদের কার্যকর কোনো অভিযান চোখে পড়ছে না। বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও নেই নিয়মিত তদারকি, নেই নমুনা পরীক্ষা, নেই দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠছে গাইবান্ধায় কি ভেজাল গুড় দেখার কেউ নেই? নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কি আদৌ সচেতন? সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য কি এতটাই অবহেলিত? সচেতনতা ও কঠোর অভিযান এখন সময়ের দাবি খেজুর গুড় কেবল একটি খাবার নয় এটি বাঙালির শীতের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। সেই ঐতিহ্যকে বিষে পরিণত হতে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এখনই প্রয়োজন নিয়মিত বাজার তদারকি ভেজাল গুড় শনাক্তে ভ্রাম্যমাণ আদালত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই ভেজাল গুড়ই হয়ে উঠবে নীরবে প্রাণঘাতী এক স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রশ্ন একটাই গাইবান্ধার মানুষ কি নিরাপদ খাবার পাবে না?