দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড খ্যাত কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পরিশোধন ও মজুতের মূল নেটওয়ার্ক। এখান থেকেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিন বিপণনকারী অঙ্গ প্রতিষ্ঠান—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে সারাদেশে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। তবে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, এ নেটওয়ার্কজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জ্বালানি তেল চুরি হয়ে আসছে।

এনএসআইয়ের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তে নামে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি টানা ২০ দিনের অনুসন্ধান শেষে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়Ñসিস্টেম লসের নামে বিপুল তেল চুরি হচ্ছে। তদন্ত শেষে গত ২৯ মে প্রতিবেদন তৈরি হলেও প্রায় দেড় মাস পর, ২২ জুলাই জ্বালানি সচিবের কাছে তা জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে তেল চুরি ও অনিয়ম রোধে ১২ দফা সুপারিশ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ আগস্ট বিপিসি চেয়ারম্যানকে সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয় জ্বালানি বিভাগ। এরপর ২৫ আগস্ট পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল ও অংশীদার প্রতিষ্ঠান এসএওসিএল-এর প্রধানদের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় বিপিসি। তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, কর্ণফুলী নদী ও ডিপোকেন্দ্রিক জ্বালানি পরিবহনপথে চুরির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য প্রতিরোধমূলক কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছে।

বিপণন কোম্পানির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইনে তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং কয়েক মাসের মধ্যে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) চালু হবে। পাশাপাশি ডিপো অটোমেশন প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে চুরি ও সিস্টেম লসের অজুহাত বন্ধ হবে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্ধারিত সিস্টেম লসের চেয়ে বাস্তবে অনেক কম ক্ষতি হওয়ার কথা। কিন্তু পরিবহনের সময় নিয়মিত তেল সরিয়ে নেওয়া হয়। একইসঙ্গে শিপব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে স্ক্র্যাপ ভেসেলের আড়ালে কালোবাজারি তেল খোলাবাজারে আসছে। এমনকি বিদেশি জাহাজ থেকেও চোরাই তেল বিক্রির প্রমাণ মেলে।

তদন্ত কমিটির ১২ দফা সুপারিশ :১. বাস্তবতার নিরিখে সিস্টেম লস পুনর্র্নিধারণ। ২. লাইটারেজের বদলে এসপিএম ও চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সরবরাহ। ৩. ম্যানুয়াল ‘ডিপ রড’ পদ্ধতির পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ‘ফ্লো মিটার’ ব্যবহার। ৪. নদী-সাগরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার। ৫. রেল ইঞ্জিন বৃদ্ধি ও ট্রানজিট টাইম কমানো। ৬. পেট্রোলপাম্পে নিয়মিত তদারকি ও কারসাজিতে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিল। ৭. বেসরকারি রিফাইনারি ও বিপণন কার্যক্রম কঠোর মনিটরিং। ৮. ট্যাংকলরি, জাহাজ ও রেলওয়াগন রিয়েল টাইম মনিটরিং ও ভেরিফিকেশন। ৯. পরিবহন ব্যবস্থায় ডিজিটাল লকিং সিস্টেম চালু। ১০. প্রধান স্থাপনা ও ডিপোর তেলের মান সমতা রক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষা। ১১. বিএসটিআই কেলিব্রেশন অনুযায়ী ট্যাংকলরিতে তেল পরিমাপ নিশ্চিতকরণ। ১২. সব পেট্রোলপাম্পে একই স্পেসিফিকেশনের ডিসপেনসিং মেশিন ব্যবহার ও ভেতরে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদী কেন্দ্রিক এ তেল চুরি শুধু বিপিসির ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে।