একেএম আবদুর রহীম, ফেনী সংবাদদাতা : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ফেনীতে ঘটে যেতে পারে অভাবনীয় ঘটনা। ফেনী জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন।তিন আসনে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে অনেক আগে। প্রধান দুইটি দল জামায়াত এবং বিএনপির মধ্যে বিএনপির প্রার্থীরা মনোনয়ন পেতে যখন লবিংয়ে ব্যস্ত তখন জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে ময়দানে চষে বেড়াচ্ছেন বহু আগে থেকেই। তাঁরা যেখানেই যাচ্ছেন সাধারণ ভোটারদের উপচেপড়া ভীড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।সর্বত্র একটি আলোচনা চলছে যে,সব দলকেতো দেখলাম এবার জামায়াতকে দেখি।একথা যারা বলছেন তাঁদের মনোবল তুঙ্গে পৌঁছেছে ডাকসু জাকসু নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের ভূমিধ্বস বিজয়ের পর সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্র শিবিরের জয়জয়কার অবস্থা ভোটারদের মধ্যে যারা অন্যদলকে ভোট দিতেন তাদের মধ্যেও একটা দোদুল্যমান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।এক সময় যারা জামায়াত শিবিরের নাম শুনলেই জ্বলে উঠতেন তাঁরা অনেকেই এখন জামায়াতের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, নেতৃবৃন্দের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। অনেকেই বলাবলি করছেন যে, সাধারণ শান্তিপ্রিয় ভোটাররা অবাধে,নির্ভয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে ডাকসু জাকসুর মত ইসলামের পক্ষে, দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ব্যাপক হারে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন।
জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা হচ্ছেন, ফেনী-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ফেনী জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর, জামায়াতের কুমিল্লা অঞ্চলের টিম সদস্য,অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া ও ফেনী-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী,তুখোড় ছাত্রনেতা,ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি,দাগনভূইয়া-সোনাগাজী উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি,অনলবর্ষী বক্তা ডাঃ ফখরুদ্দিন মানিকের অবস্থান বেশ মজবুত। তাঁদের দুজনের পক্ষে একটি গন জোয়ার দিনদিন স্পস্ট হচ্ছে। ফেনী-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী,সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য,বিশিষ্ট সমাজসেবক এডভোকেট এএসএম কামাল উদ্দিন।তিনিও তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেনীতে সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। বিশেষত বিএনপির অসংখ্য নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী। তাঁরা মাঠে ময়দানে সক্রিয় থেকে প্রচার প্রচারনা শুরু করেছেন। এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপি, জাসদ, বাসদ সহ অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় বিচরন শুরু করে দিয়েছেন।
বিএনপি এখন পর্যন্ত তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করতে পারেনি। তবুও এ জেলায় পুরোদমে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে সরগরম হয়ে পড়েছে পুরো জেলার রাজনীতি। রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মাঝে এখন চলছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা। দীর্ঘদিনের ভোটারবিহীন নির্বাচনের বৃত্ত ভেঙে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে এমনটি ধারণা স্থানীয় সাধারণ মানুষের। জেলার সংসদীয় আসন ঘুরে ভোটারদের সাথে আলাপ করে জানা যায় তারা যোগ্য এবং জনবান্ধব লোককেই ভোট দিবেন। তবে ফ্যাসিস্টমুক্ত পরিবেশে ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তবে ফ্যাসিস্টদের বিচার ও প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় সাধারন মানুষের মধ্যে যে উচ্ছাস থাকার কথা ছিল তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
ফেনী-১
ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-১আসন। দেশের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নানা কারণে ফেনীর সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-১ আসনটি জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এরই মধ্যে তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও তিন বার বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
এবার আসনটিতে খালেদা জিয়াকেই প্রার্থী চান দলটির তৃণমূল নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, শারীরিক কারণে বেগম জিয়া নির্বাচন করতে সক্ষম না হলে এখানে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বেগম জিয়ার পুত্রবধূ সৈয়দা শর্মীলা রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির গ্রাম সরকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক বেলাল আহমেদ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক দেশ রুপান্তরের সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ ও মরহুম সাঈদ ইস্কান্দারের ছেলে ব্যারিস্টার শামস ইস্কান্দারের নামও শোনা যাচ্ছে।এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুও।
এদিকে ফেনী-১ আসনে জামায়াতের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মন জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (মামুনুল হক) জেলা সভাপতি মাওলানা নাজমুল আলম এবং খেলাফত মজলিসের জেলা যুগ্ম আহবায়ক মাওলানা আবদুল আজিজ আহমদীকে নিজ নিজ দলের একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে দলটির জেলা কমিটির উপদেষ্টা ফরিদ উদ্দিন আল মোবারককে দলটির পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ফেনী-২ (সদর)
ফেনী-২ আসন হচ্ছে জেলার সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ আসন। এ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি। মনোনয়ন পেতে পারেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন (ভিপি)। এ ছাড়া এখান থেকে দলটির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার, সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল, যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হাবীব উল্যাহ মানিক। তাদের অনেকেই সাধারণ মানুষের মাঝে ঈদ-উপহার বিতরণের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের জন্য নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করে রেখেছেন।
এদিকে এই আসনটিতে দলীয় একক প্রার্থী ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও। দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমীর অধ্যাপক লিয়াকত ভূইয়াকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দিন-রাত স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের মন জয় করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা সেক্রেটারি মাওলানা একরামুল হক ভূইয়া এরই মাঝে এই আসন থেকে প্রার্থিতার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।অন্য দিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক) কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা হারুনুর রশিদ ভূইয়া ও খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সলকে দলীয় একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার মর্যাদা পূর্ন আসনটিতে কে দলের টিকেট পান তা নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।
ফেনী-৩
আসনটিতে এক সময় ফেনী সদর উপজেলার আংশিক ও সোনাগাজী উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছিল, পরে ফেনী সদর বাদ দিয়ে সোনাগাজীর সঙ্গে দাগনভূঞা উপজেলাকে সংযুক্ত করে এই আসনটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু বা তার ছেলে তাজওয়ার আউয়াল প্রার্থী হতে পারেন এমন গুঞ্জন রয়েছে। এর আগে উক্ত আসনে দলের টিকেটে নির্বাচন করেছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছোট ভাই ও দাগনভুঞা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আকবর হোসেন। এ ছাড়া
সাবেক এমপি মোশারফ হোসেনের পরিবারের কেউ কেউ প্রার্থী হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে । উক্ত আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সমবায় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডক্টর নিজাম উদ্দিন, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শাহানা আক্তার শানু, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি বেলাল মিল্লাত, সোনাগাজী উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিন বাবলু ও সাবেক পৌর মেয়র জামালউদ্দিন সেন্টু।
আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। দলীয় প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. ফখরুদ্দিন মানিক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। এ ছাড়া জেএসডির (রব) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (মামুনুল হক), কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা এনামুল হক মূসা, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা সভাপতি প্রিন্সিপাল মাওলানা মোহাম্মদ আলি মিল্লাত,ইসলামী আন্দোলনের চট্টগ্রাম মহানগরের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সাইফুদ্দিন শিপন নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
আসন্ন এ নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, দল থেকে যাকেই প্রার্থী দেবে তার জন্য তৃণমূল নেতা কর্মীদের নিয়ে কাজ করে যাব।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মুফতি আবদুল হান্নান বলেন, ফেনীর তিনটি আসনেই আমরা এককভাবে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী ঘোষণা করেছি। প্রার্থীরা প্রতিনিয়ত দলীয় সভা-সমাবেশ করে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন এবং সুখে-দুঃখে পাশে থেকে মন জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে তারা তিনজনই সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন। আশা করি এবারের নির্বাচনে জেলার সব শ্রেণি-পেশার ভোটাররা সৎ-যোগ্য ও ইসলামের পক্ষে রায় দেবেন।