মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামবাংলায় বিয়ে মানেই ছিল আলাদা এক উৎসব। আধুনিক ডেকোরেশন, মাইক্রোবাস কিংবা বিলাসী গাড়ির বহর নয়—বরং কাঠের তৈরি গরুর গাড়ি, রঙিন কাপড়ে মোড়ানো শিং, কপালে টিপ পরা গরু আর ঢোল-করতালের তালে তালে এগিয়ে যাওয়া বরযাত্রাই ছিল আনন্দের মূল চিত্র। আজ সেই দৃশ্য কেবল স্মৃতির অ্যালবামেই বন্দী।
গরুর গাড়িতে বিয়ে ছিল গর্বের ঐতিহ্য
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল কিংবা ভোলাহাট অঞ্চলে গরুর গাড়িতে বিয়ে ছিল সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এই প্রথায় অংশ নিত। বর বসতেন গরুর গাড়ির মাঝখানে পিঁড়িতে, মাথায় পাগড়ি, পাশে বন্ধুবান্ধব। সামনে ও পেছনে আরও কয়েকটি গরুর গাড়ি- কেউ নিয়ে যাচ্ছেন উপহার, কেউ গান গাইছেন, কেউ ঢোল বাজাচ্ছেন।
গ্রামের রাস্তা দিয়ে যখন বরযাত্রী যেত, তখন আশপাশের মানুষ কাজ ফেলে ছুটে আসত দেখার জন্য। শিশুদের চোখে ছিল বিস্ময়, বয়স্কদের চোখে ছিল তৃপ্তি- এযেন পুরো গ্রামের বিয়ে।
উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন
গরুর গাড়ির বিয়ে ছিল প্রকৃতিবান্ধব, শব্দদূষণহীন ও মানবিক। কোনো হর্নের কর্কস আওয়াজ নয়, ছিল কেবল চাকার ঘর্ষণ, গরুর ঘণ্টার টুংটাং শব্দ আর মানুষের হাসি। এই বিয়ে ছিল সম্পর্কের—মানুষে মানুষে, মানুষে প্রকৃতিতে।
কেন হারিয়ে গেল এই ঐতিহ্য?
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে মানুষের রুচি ও জীবনযাপন। পাকা রাস্তা, দ্রুত যানবাহন, শহুরে সংস্কৃতি আর সামাজিক ‘স্ট্যাটাস’-এর প্রতিযোগিতায় গরুর গাড়ির বিয়ে ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। অনেকে একে “সেকেলে” ভাবতে শুরু করেন। নতুন প্রজন্মের কাছে গরুর গাড়ি এখন কেবল গল্প।
আরেকটি কারণ—গরুর গাড়ি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, গরু পালনের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত।
স্মৃতির পাতায় আটকে থাকা এক ঐতিহ্য
আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিয়ে মানেই রঙিন লাইট, সাউণ্ড সিস্টেম আর মোটরযানের বহর। গরুর গাড়ির সেই ধীরগতির আনন্দ, মানুষের সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠতা—সবই যেন হারিয়ে গেছে। প্রবীণরা আক্ষেপ করে বলেন, “আগে বিয়েতে আনন্দ ছিল, এখন আছে শুধু আয়োজন।”
ফিরে আসতে পারে কি আবার?
ঐতিহ্য পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও, সাংস্কৃতিক উৎসব, গ্রামবাংলার মেলা কিংবা প্রতীকী আয়োজনে গরুর গাড়ির বিয়ে নতুন করে তুলে ধরা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম জানবে তাদের শিকড়ের কথা, বুঝবে সহজ আনন্দের মূল্য।
গরুর গাড়িতে বিয়ে শুধু একটি বাহন নয়—এটি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ। চাকার সেই মৃদু শব্দ আজ আর শোনা যায় না, কিন্তু স্মৃতিতে তা এখনো বেঁচে আছে—নীরবে, গভীর মমতায়।