কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলায় ইটনা সরকারি কলেজের জায়গা কৌশলে দখল করে নিচ্ছেন উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এসএম কামাল হোসেন। ‘পৈত্রিক সূত্রে সম্পত্তির মালিক’ উল্লেখ করে তার ভাতিজা মাহমুদুল হাসান মাজহারুল কলেজের জায়গায় সাইনবোর্ড স্থাপন করেছেন। এছাড়া কলেজের পুকুরের মধ্যে বেষ্টনী তৈরি করে পুকুরের একটি বিশাল অংশে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন।

পবিত্র রমজান ও ঈদ উপলক্ষ্যে কলেজ দীর্ঘদিন ছুটি থাকার সময়ে গত ২৩ মার্চ সাইনবোর্ড দিয়ে জায়গা ও পুকুর দখল করার পর গত বুধবার (৮ এপ্রিল) সকাল থেকে জায়গাটিতে সিমেন্টের পিলার বসানো হচ্ছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। বিষয়টি নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মাঝেও হতাশা বিরাজ করছে। তবে কলেজের জায়গা দখলকাণ্ডে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এসএম কামাল হোসেন নেতৃত্ব দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে কেউ-ই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কলেজের সম্পত্তি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।

কলেজ সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যন্ত হাওর উপজেলা ইটনায় কোনো কলেজ না থাকায় এখানকার ছাত্র/ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার লাভের সুযোগ তৈরির জন্য ১৯৯৮ সালে স্থানীয় প্রচেষ্টায় ইটনা মহাবিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ প্রতিষ্ঠানটির জন্যে জমি দান করেন। এরপর থেকে দান হিসেবে পাওয়া জায়গাতেই কলেজটির অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চলে আসছে। ২০১৬ সালে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। কলেজটির জায়গার একটি অংশে একটি বিশাল আয়তনের পুকুর রয়েছে।

পুকুরটি লিজ দেওয়ার মাধ্যমে কলেজটি এ থেকে আর্থিকভাবে উপকৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে শাহীন মিয়া নামে এক ব্যক্তি পুকুরটি লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে কলেজ বন্ধ থাকার সময়ে গত ২৩শে মার্চ পুকুরটির বেশিরভাগ অংশে বেষ্টনী তৈরি করে এবং পুকুরের পাড়ে সাইনবোর্ড স্থাপন করে অন্তত এক একরের মতো জায়গা দখলে নেন উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এসএম কামাল হোসেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কলেজসংলগ্ন ‍পুকুরপাড়ে সম্পত্তিসংক্রান্ত মালিকানার একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা। সাইনবোর্ডটিতে লেখা রয়েছে, “পৈত্রিক সূত্রে নিম্ন তফসিল বর্ণিত সম্পত্তির মালিক এডভোকেট মাহমুদুল হাসান (মাজহারুল) গং।” লেখার নিচের অংশে সম্পত্তির তফসিল, জমির পরিমাণ ৪১ শতাংশ ++ এবং মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মো. কামরুজ্জামান বলেন, আমি কলেজটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কর্মরত আছি। বিদ্যমান সম্পত্তি কলেজকে ভোগদখল করতে দেখে আসছি। এখন কলেজের পুকুরের বেশিরভাগ অংশ নিজেদের দাবি করে এডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাজহারুল গং এর নামে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। এর ফলে কলেজের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

এলাকার শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলের বক্তব্য অনুযায়ী, জায়গাটি কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইটনা সরকারি কলেজ-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এটি ওয়াকফভুক্ত সম্পত্তি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। ফলে হঠাৎ করে ব্যক্তিগত মালিকানার দাবি তোলা এবং সাইনবোর্ড স্থাপনকে তারা “পরিকল্পিত দখলের প্রচেষ্টা” হিসেবে দেখছেন। সরকারদলীয় প্রভাবের কারণেই এ রকম একটি দখল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটি শুধু একটি জমির বিষয় নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ওপর আঘাত। কলেজের জমি দখল মানে পুরো এলাকার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। আমরা কোনোভাবেই এটি মেনে নেব না।”

স্থানীয় অনেকে অভিযোগ করেন, দলীয় পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি দখলের এই চেষ্টা যদি প্রতিহত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান কেউই নিরাপদ থাকবে না।

এ বিষয়ে ইটনা উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এসএম কামাল হোসেন বলেন, আমাদের পরিবারের অনেক জায়গা এখানে রয়েছে। আমাদের বসতবাড়িও এখানে। কলেজ হওয়ার পর দুইটা হোস্টেলও হয়েছে আমাদের জায়গায়। আওয়ামী লীগের আমলে নানাভাবে কলেজের নামে আমাদের এসব জায়গা ভোগদখল করা হয়েছে। যে জায়গা নিয়ে কথা ওঠছে, সেটি আমার জায়গা না, আমার বড় ভাইয়ের জায়গা। তার ছেলেরা মামলা-মোকদ্দমা করে রায় পেয়েছে। সেভাবেই হয়তো তারা জায়গাটিতে দখলে গেছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আমি জানি না। এর সঙ্গে আমি কোনোভাবে জড়িতও নই।