ইবরাহীম খলিল বান্দরবান থেকে : তীব্র শীতের মধ্যে পাহাড়ে বেড়ানোর সাধ ছিল। মিলে গেল সুযোগও। বিজিবির একটি অনুষ্ঠানে কভার করার সুযোগ করে দিলেন প্রধান প্রতিবেদক নাসির উদ্দিন শোয়েব ভাই। যেতে হবে বান্দরবানে। ১৩ই জানুয়ারি সকাল ৭টায় পিলখানার সামনে থেকে বিলাসবহুল গাড়িতে করে রওয়ানা দিলাম। বান্দরবান পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা বাজলো। রাতের শুরুতেই বাস আমাদে মাথায় পাঁচ তারকা হোটেল হিল-ভিউতে নামিয়ে দেয়। আমরা পাঁচতলার পূর্ব-পাশের রুমে উঠি। পূর্ব পাশের রুম নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো রাতে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা। রুমে উঠেই আমার নজর গেল বারান্দায়। পোশাক বদল করে ৩ ফুট বাই দুই ফুটের ছোট বারান্দায় দাঁড়ালাম। সেখানে আবার ছোট্ট চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। রি-রি বাতাসে আরামদায়ক ঠাণ্ডা। কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই বসার ইচ্ছে জাগলো। অবাক করার মতো বিষয়। দেশের কোথাও কোথাও শৈত্যপ্রবাহ থাকলেও বান্দরবানে তেমন ঠাণ্ডা নেই। বেশ কিছু সময় বাতাসে মগ্ন থাকার পর দৃষ্টি যায় ছোট্ট টিলার দিকে। বারান্দাতে বসে চোখ জোরানো সুন্দর পাহাড় দৃষ্টির সামনে। এ যেন পাহাড়ের উপর আরেক পাহাড়। এই পাহাড়ে শোভা পাচ্ছে চিকন লম্বাটে বৃক্ষ। মাটি আর পাথুরে মিশেলের পাহাড়। হালকা নিয়ন লাইটের ফাঁক গলিয়ে পাহাড়ের আবছা ছায়া চোখে অনিন্দ্য সুন্দর লাগছে। নিচেই কলাপাতা নামের রেস্টুরেন্ট। এখানকার হোটেলগুলো পর্যটনের সময়ে বেশ জমকালো থাকে।

প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। পূর্ব রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান একসাথে একটি জেলা ছিল। ১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভেঙে তিনটি জেলা গঠন করা হয়। ধর্মবিশ্বাস অনুসারে এ জেলার মোট জনসংখ্যার ৫২.৬৮% মুসলিম, ৩.৪২% হিন্দু, ২৯.৫২% বৌদ্ধ এবং ৯.৭৮% খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। বেশীরভাগ মুসলিম ও হিন্দুরা বাংলাভাষী। এছাড়াও এ জেলায় মারমা, চাকমা, চাক, বম, মুরং, ত্রিপুরা, খেয়াং, খুমি, লুসাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।

দেশে যে কয়টি জেলায় পাহাড় দেখার জন্য পর্যটকরা ভিড় জমায় এর মধ্যে বান্দরবান একটি। প্রতিদিন হাজার হাজার নির্জন প্রকৃতি ও পাহাড়প্রেমি বান্দরবানে ভিড় করে। আজ আমার পা সেখানে পড়লো। নিজের মধ্যে একধরনের উত্তেজনা কাজ করছে।

এই বান্দরবান জেলার নীলগিরি ও নীলাচল মেঘের রাজ্যে ভেসে থাকা, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার জন্য বিখ্যাত। কেওক্রাডং পর্বত বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে পরিচিত, যা ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চারের জন্য দারুণ। চিম্বুক পাহাড় বান্দরবানের অন্যতম উঁচু একটি চূড়া, যেখান থেকে চারপাশের পাহাড়ের বিশালতা উপভোগ করা যায়। মৌডক মুয়াল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে দাবি করা হয়; যা দুর্গম ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত। বগালেক পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক হ্রদ, যা তার রহস্যময় সৌন্দর্য ও চারপাশের পরিবেশের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তাজিংডং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে পরিচিত এবং এটিও একটি জনপ্রিয় পর্বতশৃঙ্গ।

নাফাখুম ও আমিয়াখুম জলপ্রপাত পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা বিশাল জলপ্রপাত, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। শঙ্খ নদী পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া এই নদীর সৌন্দর্যও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। গোল্ডেন টেম্পল পাহাড়ের উপর নির্মিত এই বৌদ্ধ মন্দিরটি বান্দরবানের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও পর্যটন আকর্ষণ। এছাড়া বান্দরবানের প্রতিটি কোণায় নীরবে নিভৃতে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় যা সবুজ প্রকৃতি, উপজাতীয় জীবনযাত্রা এবং ঝরনার সমাহার নিয়ে এক ভিন্ন জগৎ তৈরি করেছে। এবং পর্যটককে ডাকছে।

এসব পর্যটককে বরণ করে নেওয়ার জন্য সব আয়োজন করে রেখেছেন স্থানীয়রা। গড়ে উঠেছে বড় বড় হোটেল। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব জেলা থেকে আসে গণ পরিবহন। রয়েছে বিলাসবহুল পরিবহনও। আমরা যে পরিবহণে বান্দরবানে গিয়েছি পুরোটাই স্লিপার এবং এসিযুক্ত বাস। বলতে গেলে ঘুমাতে ঘুমাতেই পাহাড়ের শহরে যাওয়া। হোটেল রুমে উঠে বলতে গেলে খুব দ্রুতই ফ্রেশ হয়ে আমরা নিচে খাবারের জন্য যাই। আগে থেইে ফিক্সট করে রাখায় আমাদের যাওয়া মাত্রই পছন্দের খাবার এনে দেয়। এবং তৃপ্তিসহকারে খেয়ে নেই। এরপর পায়চারির পালা। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার আল আমিন সাহেবের প্রস্তাবে আমরা হালকা শীতের মধ্যে বেরিয়ে পরি রাতের বান্দরবান শহর উপভোগ করতে। এরমধ্যে বাংলাদেশ সংবাদসংস্থার রানা ভাই, দৈনিক যায় যায় দিনের গাফফার খান, বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোরের কামাল ভাই। আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু নদীর ব্রীজ পর্যন্ত চলে যাই। নিচ দিয়ে নীরবে নিভৃতে আপন মনে বয়ে চলছে সাঙ্গু নদী। ব্রীজের ওপর থেকে নদীকে সামনে রেখে আল আমিন ভাই নিজস্বী তুলে নিলেন। তার পাশাপাশি নিজস্বী তুললেন আরও কয়েকজন। কথায় কথায় বলা হলো একটা সময় এই বান্দরবানে রাতে বের হওয়া অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ থাকলে এখন যেকোন সময় বের হওয়া যায় অনায়াসেই। আমরা দেখলাম শহরের বুকে দোকানীরা পাহাড়ি কলাসহ সুস্বাদু ফলফলাদি নিয়ে বসে আছে। গাফ্ফার খান ভাই কলা কিনলেন একশ’ টাকার। এসব কলার ভিন্ন স্বাদ। ইচ্ছে ছিল বার্মা মার্কেটে যাওয়ার। কিন্তু ততক্ষণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হোটেলে ফিরতে হলো সাঙ্গু নদীর ব্রীজ থেকেই। কারণ রাতের গভীরতা যত বাড়ছে হোটেলে ফেরার তাড়াও ত্বরান্বিত করছে। আমরা দ্রুতই হোটেলে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দেই; কারণ সকালে ঘুম থেকে উঠার তাড়া রয়েছে।