চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় জড়িত মূল আসামী বাবু শেখ (৪৫) কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানাধীন কুমিরা কাজীপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, গত ১ মার্চ সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ড পাহাড় এলাকায় একটি নির্মাণাধীন সড়কের পাশে গলা কাটা অবস্থায় এক শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় এক নির্মাণশ্রমিক। পরে তিনি বিষয়টি থানায় জানান।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ মার্চ ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত) এবং পেনাল কোডের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, নিহত শিশুটির পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্ত বাবু শেখের পূর্ব বিরোধ ছিল। ঘটনার দিন সকালে শিশুটিকে চকলেট কিনে দেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় বাবু শেখ। প্রথমে কুমিরা থেকে বাসে করে সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে যায় তারা। পরে সেখান থেকে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে শিশুটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ সময় শিশুটি চিৎকার করলে অভিযুক্ত তার কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে পালিয়ে যায়।
রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটি কিছুক্ষণ পর নির্মাণাধীন সড়কের দিকে উঠে এলে শ্রমিকরা তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযুক্তকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয় যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত জেলা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দীন তালুকদার।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল জানান, ঘটনার মূল আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সীতাকুণ্ড থানায় সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
চিকিৎসা ও মৃত্যুর আগে শেষ সময় : পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় শিশুটির অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। সে ইশারায় স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিল। তবে রাত আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
নিহত শিশুর চাচা আজিজ জানান, সে পানি ও খাবার চাইছিল; কিন্তু চিকিৎসকদের নিষেধ থাকায় কিছু দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এর আগে রোববার রাতে তার গলায় অস্ত্রোপচার করা হয়। পরদিন তাকে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়া হলে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে পুনরায় নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।
ধর্ষণের আলামত : চিকিৎসক ও অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে আঘাতের মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে উরুর অংশে কাটাছেঁড়ার চিহ্ন ছিল।
পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে শিশুটি ইশারায় কিছু তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং একটি নাম নির্দেশ করেছিল; তবে তা পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
যেভাবে উদ্ধার : গত রোববার সকালে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের ইকোপার্কের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। চন্দ্রনাথ মন্দির সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা প্রথম তাকে দেখতে পান। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মামলা হত্যা ধারায় রূপান্তর : ঘটনার দিন রাতেই শিশুটির মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম জানান, অজ্ঞাতপরিচয় আসামীদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। শিশুটির মৃত্যুর পর মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার পেছনের কারণ ও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।