দীর্ঘ ১৭ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ভোটের আমেজ বিরাজ করছে। ভোট উৎসবে অংশ নিতে ঈদের ছুটির মতো দলে দলে মানুষ নগরী ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন। এতে কর্মব্যস্ত নগরী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়েছে।
ভোটের আগের দিন গতকাল বুধবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নগরীর বন্দর স্টেডিয়াম থেকে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনি সামগ্রী পাঠানো হয়। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন এ কার্যক্রম তদারকি করেন।
এছাড়া জেলা স্টেডিয়াম থেকে মহানগরীর আওতাধীন বাকি পাঁচটি আসনের ভোটের সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা নিজ নিজ কেন্দ্রের সরঞ্জাম গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে জেলার বাকি ১০টি আসনের নির্বাচনি সরঞ্জাম সংশ্লিষ্ট উপজেলা সদরের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।
অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসাইন জানান, দুপুরের মধ্যেই প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের কাছে ভোটের সরঞ্জাম হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা কেন্দ্রগুলোতে বুথ স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করবেন।
এদিন দুপুরে জেলা স্টেডিয়ামে নির্বাচনি সরঞ্জাম বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বিভাগীয় কমিশনার ও কয়েকটি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের প্রস্তুতি অতীতের সব নির্বাচনের চেয়ে বড় পরিসরে নেয়া হয়েছে। প্রশাসন কোনো ধরনের ঝুঁকি অনুভব করছে না এবং সমন্বিতভাবে কাজ করে নির্বিঘœ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া এলাকায় নির্বাচনি প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন ঘিরে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
সরকারি ছুটির কারণে গত মঙ্গলবার বিকেল থেকেই শ্রমজীবী মানুষেরা নগরী ছাড়তে শুরু করেন। ফলে নগরীর প্রবেশপথগুলোতে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা যায়। বুধবার সকালেও নিউমার্কেট, টাইগারপাসসহ আশপাশের ব্যস্ত এলাকা অনেকটাই ফাঁকা দেখা গেছে।
১৯৬৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৬৫৩টি গুরুত্বপূর্ণ
চট্টগ্রাম মহানগরী ও ১৫ উপজেলা মিলিয়ে ১৬টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১ হাজার ৯৬৫টি। এর মধ্যে পুলিশ ৬৫৩টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন, নারী ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৭০ জন।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে ব্যালট পেপার আগেই পৌঁছানো হয়েছে। মঙ্গলবার ভোটের অন্যান্য উপকরণ পাঠানো হয় এবং বুধবার সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রে সরঞ্জাম সরবরাহ সম্পন্ন করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ পরিচালনার জন্য প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত রয়েছেন।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ঝুঁকি বিবেচনায় দুর্গম এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল এবং সন্দ্বীপসহ বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনেক কেন্দ্র শহরের কাছাকাছি হলেও স্থানীয় পরিবেশ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বিবেচনায় অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন বলেন, যেসব কেন্দ্রে বাড়তি নজরদারি প্রয়োজন সেখানে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন থাকবে। স্ট্রাইকিং ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত টহল দেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, উড়িরচর, ফটিকছড়ি ও বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকাসহ কিছু দূরবর্তী কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সেনাবাহিনীর ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, আনসার-ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশসহ ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের আগে ও পরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক থাকবে।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে এবার মোট ১১৫ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি সব আসনে, জামায়াতে ইসলামী ১৪টি আসনে এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ১০ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন।