ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা : ফুলবাড়ীতে বিভিন্ন সবজির দাম বেশী হলেও আলুর দাম অসাভাবিকভাবে কম হওয়ায় আলু চাষীদের লোকসানের আশঙ্কায় দিশাহারা।
মাছে-ভাতের পর আলু গ্রামীণ মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। সারা বছর সবজির প্রয়োজন মিটিয়ে সংসার খরচ ভালভাবে চালাতে কৃষক আলুর আবাদ করে থাকেন। চাষাবাদ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেকেই আলু চাষে এগিয়ে আসেন না। আলুর বাজার মূল্য অনিশ্চিত। তাই চাষিরা নিরবছিন্নভাবে আলু চাষে মনোযোগী হতে পারেন না। গত বছর আলুতে লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে এ বছর ও আলু চাষে মনোযোগী হয়েছে কৃষক। গত বছরের তুলনায় এ বছর ফুলবাড়ীতে আলুর আবাদ কম হয়েছে। তবুও আলুর বর্তমান বাজার মূল্যে চাষিরা হতাশ। ফলে, ধার দেনা করে যারা আলু আবাদ করেছেন তারা রয়েছেন লোকসান আর ধার দেনা শোধের দুশ্চিন্তায়। আগাম রোপণের জন্য বীজ কেনা, সার-কীটনাষক, সেচ ও দীনমজুর খরচসহ প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পরেছে প্রায় ১৬-১৮ টাকা। ফুলবাড়ীর বিভিন্ন হাটবাজারে লাল পাকরি, কার্ডিনাল, সাদাহলান্ড সহ দেশি বিভিন্ন জাতের আলু ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা জমিতে বিক্রি করছেন ১০ থেকে ১৫ টাকা। এই দরে আলু বিক্রি করে কৃষকের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা না থাকায় উৎপাদিত সব আলু এখন বাজারে বিক্রি করা সম্ভব নয়। হিমাগার ছাড়া সংরক্ষণের বিকল্প না থাকায় অনেকেই বর্তমান মূল্যে আলু বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউবা বাড়িতেই স্থানীয় ভাবে সংরক্ষন করছেন। ফলে প্রতিদিন ই দাম কমে আসছে আলুর।উত্তর বড়ভিটা গ্রামের আলুচাষী মো: শাহজালাল মিয়া জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন, প্রতি কেজি আলুবিজ কিনেছেন ৫০টাকা দরে , বীজ কেনা ও অন্যান্য খরচ সহ দুই বিঘা জমিতে প্রায় ৫০,০০০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে বাজারে আলুর পাইকারি ক্রেতা নাই।তাই বাধ্য হয়েই ষ্টোরে রাখতে হয়। ষ্টোরে প্রতি ৫০ কেজি আলু এক বছর রাখার জন্য ভাড়া দিতে হয় ৫০০টাকা। এই হিসাবে আলু রেখে আলুর দাম না বাড়লে লোকসানে পড়তে হবে। ষ্টোরে না রাখলে আলু বিক্রি করতে না পারলে বাড়িতে পচে যেতে পারে।
বড়ভিটাগ্রামের আলম মিয়া বলেন, এনজিও হতে সুদে টাকা নিয়ে ও হাত লোন নিয়ে খন্দ চুক্তিতে সাতবিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন, আলু ঘরে তুললেও দাম কম। কম দামেও বর্তমানে ক্রেতা নাই। তাই বাধ্য হয়েই আলু হিমাগারে রাখতে হচ্ছে। হিমাগার ভাড়া দিয়ে আগামীতে আলুর দাম কম হলে তাকে লোকসানে পড়তে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে আলুর চাহিদা রয়েছে। সরকার আগাম আলু রপ্তানির ব্যবস্থা করলে সকল কৃষক লাভবান হতো।
ফুলবাড়ী কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, ফুলবাড়ী উপজেলায় এবার ৫৭০হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর ফলন ভাল হয়েছে। কৃষকদের স্থানীয়ভাবে আলু সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে আলুর দাম বাড়তেও পারে।
কালাই (জয়পুরহাট) : জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দামের ধসে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। মাঠে ফলন ভালো হওয়ায় শুরুতে আশাবাদী ছিলেন চাষিরা, কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এখন সেই আশাই পরিণত হয়েছে হতাশায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে বিঘাপ্রতি হাজার হাজার টাকা লোকসান গুণছেন তারা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কালাই উপজেলায় ১০ হাজার ১০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাই কম থাকায় ফলন হয়েছে ভালো। অনেক ক্ষেত্রেই বিঘাপ্রতি ৭৫ থেকে ৮৫ মণ পর্যন্ত আলু উৎপাদন হয়েছে। কৃষকেরা মিউজিকা, ডায়মন্ড, ক্যারেজ, রোজেটাসহ বিভিন্ন জাতের আলু আবাদ করেছেন।
তবে বাজারদর কমে যাওয়ায় এই ভালো ফলনও কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। বর্তমানে কেজিপ্রতি আলুর পাইকারি দাম আট থেকে ১২ টাকার মধ্যে। প্রতি মণ সাদা আলু বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়, গ্যানোলা জাতের আলু ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। কোথাও আগাম জাতের আলু ২৭০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও তাতেও খরচ উঠছে না। এক বিঘা জমিতে আলু চাষে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বেশি নয়।ফলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।
আলুচাষি সরোয়ার হোসেন বলেন, তাঁর ১৭০ মণ আলু হয়েছে কিন্তু বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।মজুরি বাদ দিলে হাতে কিছুই থাকছে না। আলাল উদ্দিন বলেন, আলু আবাদ করে যেন তারা পাপ করেছেন। প্রতি বিঘায় শুধু মজুরির খরচই ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা, তবুও ব্যবসায়ীরা ঠিক দাম দিচ্ছেন না, অনেক সময় আলু নিয়ে পরে টাকা দেয়ার কথা বলেন। সুমন্ত চন্দ্র প্রামাণিক জানান, তাঁর বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার টাকায়, এতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।