মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে : মোংলা সমুদ্র বন্দরের আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণে একযোগে ৯টি বৃহৎ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সমুদ্র বন্দরকে আধুনিক, টেকসই ও বিশ্বমানের নৌ-যোগাযোগ কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যেই এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে চারটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, নতুন করে দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে এবং আরও তিনটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং এটি জাতীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত এই বন্দরকে আধুনিকায়ন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একাধিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট ৫ হাজার ৬০৬ কোটি ৪১ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ এবং ‘বন্দর চ্যানেল সংরক্ষণ ড্রেজিং’ শীর্ষক দুটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন হলে বন্দরের চ্যানেলে সাড়ে ৯ থেকে ১০ মিটার গভীরতায় জাহাজ চলাচল সহজ হবে, ফলে বড় আকারের জাহাজ নির্বিঘ্নে পণ্য খালাস ও বোঝাই করতে পারবে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি-রপ্তানি এবং চার লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জিত হবে।

এর আগে গৃহীত মোট ৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ের চারটি প্রকল্পের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দরের সহায়ক জলযান সংগ্রহ, পশুর চ্যানেলে ইনার বার ড্রেজিং, মোংলা পোর্টের আপগ্রেডেশন এবং দুটি অসম্পূর্ণ জেটি নির্মাণ। একই সঙ্গে বন্দরকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে নতুন করে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় পশুর চ্যানেল শাসন ও সম্প্রসারণের জন্য সমীক্ষা কার্যক্রম, ট্রেলিং সাকশন হপার ও কাটার সাকশন মিলিয়ে তিনটি ড্রেজার ক্রয় এবং উন্নয়ন সেবা সহায়ক দুটি মুরিং বোট সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বন্দরের চ্যানেলে নাব্যতা বজায় থাকবে, জাহাজের আগমন ও প্রস্থান আরও দ্রুত হবে এবং সামগ্রিক পরিচালন ব্যবস্থায় গতি আসবে। একই সঙ্গে শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভিডোরসসহ সংশ্লিষ্ট খাতের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে মোংলা বন্দর ধীরে ধীরে একটি প্রতিযোগিতামূলক, ব্যবসাবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সমুদ্র বন্দরে পরিণত হবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (অর্থ) ও পরিচালক (প্রশাসন) উপসচিব কাজী আবেদ হোসেন জানান, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত ‘মোংলা বন্দরে আধুনিক বর্জ্য ও তেল নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পটি চলতি বছরের জুন মাসে সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে জাহাজ ও আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত বর্জ্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে। এটি আন্তর্জাতিক ‘মারপল কনভেনশন’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সুন্দরবন ও পশুর চ্যানেলকে দূষণমুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি চলমান অন্যান্য প্রকল্পের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মোংলা বন্দরে কোনো জাহাজজট নেই। ফলে বন্দর ব্যবহারকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। গাড়ি আমদানিকারকদের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা, সাতটি কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ৩৮টি সহায়ক জলযান—যার মধ্যে টাগবোট, পাইলট বোট, সার্ভে বোট ও ড্রেজার অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক ‘আইএসপিএস কোড’ অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল এবং সড়ক, রেল ও নৌপথে সহজ পণ্য পরিবহনের সুযোগ মোংলা বন্দরের কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করেছে।

বর্তমানে মোংলা বন্দরের বার্ষিক সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি জাহাজ হ্যান্ডলিং, এক কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন কার্গো, এক লাখ টিইইউ কনটেইনার এবং ২০ হাজার গাড়ি হ্যান্ডলিংয়ের। এছাড়া ৮.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানোর সুবিধা, ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলে দিন-রাত নিরাপদ নৌ চলাচলের ব্যবস্থা এবং বিদেশি জাহাজের জন্য ৪৯টি নির্ধারিত বার্থিং পয়েন্ট রয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহীন রহমান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মোংলা বন্দর অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। এই বন্দর দিয়ে বর্তমানে নেপাল, ভুটান, ভারত ও চীনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর আগ্রহ বাড়ায় বন্দরের ওপর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রম অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবেশবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক সমুদ্র বন্দর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।