বায়জীদ বোস্তামী, বরিশাল অফিস

বরিশাল জেলার ছয়টি আসন ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অধীনে ছিল, এই আসনসমূহে বেশিরভাগ সময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া এই আসনসমূহে আওয়ামী লীগের বিজয়ী হওয়ার রেকর্ড খুব কম। প্রতি নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচনী বৈতরণী ভালোভাবে পার করলেও এবারে নির্বাচনে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জামায়াত হতে পারে একটি বড় ফ্যাক্টর। জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ৮ দল সমন্বিতভাবে প্রার্থী ঘোষণা করলে বিএনপি’র প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং জামায়াতসহ ৮ দলের প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়া সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি আসনে অতীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ী হয়ে আসার নজীর না থাকলেও ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বরিশালের ৬টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছিলেন এবং প্রতি আসনেই ভালো ভোট পেয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে এবং অল্প ভোটে পরাজিত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পরে সারাদেশের মতো বরিশালের ছয়টি নির্বাচনী আসনে জনগণের মধ্যে ব্যাপক চিন্তার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, ধারণা করা হচ্ছে ৫ই আগস্ট এর পরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিভিন্ন অপতৎপরতার কারণে এবং জামায়াতের ধারাবাহিক সামাজিক কাজ করার কারণে এবারে নির্বাচনে জনগণ জামায়াতকে ভোট দিবে।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাইরেও বরিশালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর হল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। কারণ সারাদেশে ইসলামী আন্দোলনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তাদের মূল কাজ বরিশালের সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নে, কারণে বরিশালে আসনসমূহে তাদের উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে। তাদের মূল মার্কাজ বরিশালে হওয়ার কারণে বরিশাল জেলার আসানসমূহের প্রতি তাদের আলাদা নজর রয়েছে। এছাড়াও এবি পার্টির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বরিশালের মানুষ হওয়াতে তিনিও আলোচনা এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের প্রভাবে এবারে নির্বাচনে ভোটারগণ অনেক বেশি চিন্তা করে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবে যার ফলে গত এক বছরে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডে কারণে চাপে পড়তে পারে বিএনপি।

বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝড়া) : বরিশাল জেলার গৌরনদী ও আগৈলঝড়া উপজেলা নিয়ে বরিশাল এক আসন গঠিত। এ আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছে কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন তবে তার উপরে রয়েছে সংস্কারপন্থী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ। স্থানীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর না নেয়ার কারণে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান নির্বাচন করতে চাচ্ছেন এবং তাকে সহযোগিতা করছেন আরেক মনোনয়ন বঞ্চিত দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কুদ্দুসুর রহমান। এর ফলে নির্বাচনী মাঠে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দিতার মুখোমুখি হচ্ছেন স্বপন। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম বক্তা হওয়ার কারণে সর্বমহলে একটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে যার ফলে তার মাঠের অবস্থা ভালো। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে কোন সংযোগ করছেন রাসেল সরদার মেহেদী।

বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) : উজিরপুর ও বানারীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল দুই আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছেন উজিরপুর উপজেলা সভাপতি এম সাইফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। ইতিপূর্বেও তিনি একই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে ও বরিশাল সিটিতে মেয়র পদে নির্বাচন করে পরাজিত হয়। তার ব্যক্তিগত কিছু ভোট ব্যাংকও নির্বাচনী এলাকায় রয়েছে কিন্তু বড় ফ্যাক্টর নিজ দলের মনোনায়ন বঞ্চিতরা। উপরে উপরে সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও ভিতরে কোন্দল চরমে। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন জেলা নায়েবে আমীর মাস্টার আব্দুল মান্নান, যিনি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে নির্বাচন করবে কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা নেসার উদ্দিন।

বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) : মুলাদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল তিন আসন। এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বাংলাদেশ জামায়েত ইসলাম মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বরিশাল মহানগর আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা জহির উদ্দিন মু. বাবর। মাওলানা বাবরের ছাত্র জীবন থেকে মুলাদি বাবুগঞ্জ এলাকায় পদচারণা থাকায় প্রচারণায় তিনি বেশ সুবিধা পাচ্ছেন, দুই উপজেলাতেই প্রতিটি অলি গলিতে তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির এখানে দুইটি গ্রুপ পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে আছে এক গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিনা রহমান ও অন্য গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন পাওয়া কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন, এই দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরমে। এছাড়াও এই আসনে নির্বাচন করবেন এবি পার্টির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ও ইসলামী আন্দোলন মনোনীত প্রার্থী উপাধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম এছাড়া জেলে বসেই মনোনয়নপত্র কিনেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির নেতা অ্যাডভোকেট গোলাম কিবরিয়া টিপু।

বরিশাল-৪ (মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা) : নদী ভাঙনসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলা নিয়ে বরিশাল ৪ আসন গঠিত। বিএনপি’র কোন্দলের কারণে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে আছেন জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও বরিশাল জেলা আমীর অধ্যাপক আব্দুল জব্বার। ইতিপূর্বেও জামায়াত এই আসনে নির্বাচনে ভালো ফলাফল করার কারণে এবারের নির্বাচনে এই আসন নিয়ে জামায়াত নেতৃবৃন্দ খুবই আশাবাদী। এই আসনে বিএনপি’র অন্তকোন্দল রেকর্ড পরিমাণ। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব হাসান দলীয় মনোনয়ন পেলেও সেটার মানতে নারাজ সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ তিনিও নিজের মত করে নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে এই দুই গ্রুপ একাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এখানে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মুফতি সৈয়দ ইসহাক মুহাম্মদ আবুল খায়েরকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তিনিও মাঠে সক্রিয় আছেন।

বরিশাল-৫ (সদর) : বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে হেভিওয়েট আসন বরিশাল সদর আসন। বরিশাল সদর আসনে জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মুয়াযয্ম হোসাইন হেলাল। অ্যাডভোকেট হেলাল ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে বরিশাল শহরের স্থায়ী বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন বরিশাল মহানগরীর আমীর ছিলেন যার ফলে বরিশালের লোকজনের সাথে তার দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরে বরিশালের অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন। এই আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়র অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার। তবে এখানে মনোনায়ন প্রত্যাশী অনেক নেতা উপরে উপরে সরোয়ারকে সমর্থন দিলেও ভিতরে রয়েছে তীব্র অসন্তোষ। এই নেতাদের তৎপরতার উপরে নির্ভর করবে বরিশাল সদরের বিএনপির ভবিষ্যৎ। এখান থেকে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি ফয়জুল করিম নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়ে মনোনয়ন কিনেছেন। এই আসনে এবি পার্টি, এনসিপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলেরও প্রচারণা লক্ষ্য করা যায়।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) : একটি মাত্র উপজেলা বাকেরগঞ্জ নিয়ে বরিশাল ৬ আসন গঠিত। এখানে বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান, ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদুন্নবী তালুকদার নির্বাচন করবেন। তারা সকলেই পূর্বে থেকে নির্বাচনী কাজ করে যাচ্ছেন।