ফিরনি-পায়েস, জর্দা-সেমাই, গোশত-ডেজার্টে সাজানো টেবিলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা আপ্যায়িত হতেন। টানা ১৬ বছর খুলনায় বসবাসরত শেখ হাসিনার চাচাতো ভাইদের বাসভবন শেরে বাংলা রোডের শেখবাড়ি আর ২ নং কাস্টমঘাটে গগণবাবু রোডস্থ অব্যাহতিপ্রাপ্ত কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের বাসভবনসহ খুলনার জনপ্রতিনিধিদের বাড়ির চিত্র ছিল এমনি। তখন তাদের বাসার ভিতর ও বাহির ছাপিয়ে সামনের সড়ক থাকতো দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপচেপড়া ভিড়। এবারের ঈদে সেখানে ছিল ধ্বংসাবশেষ এবং সুনসান-নিস্তব্ধ জনমানবশূন্য অবস্থা।

অপরদিকে, ফ্যাসিস্ট মুক্ত বাংলাদেশে এবারের ঈদে আনন্দের নতুন মাত্রা যোগ হয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের। খুলনার শিরোমনিস্থ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, নগরীর মিয়াপাড়াস্থ সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কয়রাস্থ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল সহকারী পরিচালক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, মুন্সীপাড়ায় মহানগর বিএনপি’র সভাপতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা, বসুপাড়ায় সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন, মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান ও সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন এর বাসভবনে নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ঠাঁসা ভিড়। টুটপাড়া এলাকায় জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টুর বাসায়ও ছিল নেতা-কর্মীদের আপ্যায়ন। প্রিয় নেতাদের সান্নিধ্যে এসে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে উদগ্রীব ছিলেন নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। ঈদের জামাত শেষে দলটির নেতা-কর্মীদের গন্তব্য তাই শীর্ষ নেতাদের বাসভবন। ফিরনী-পায়েস খাওয়ার পর আয়েসি ভঙ্গিতেই ঈদ উদযাপন করেছেন খুলনা বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা। পরস্পরের সাথে সেলফি তুলতেও মশগুল কেউ কেউ। আর প্রিয় নেতার সাথে ক্যামেরাবন্দী হওয়ার আকাক্সক্ষা তো ছিলই।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী মনোনীত খুলনার ছয়টি আসনে ঘোষিত প্রার্থীরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় ঈদের জামাতে অংশ নেওয়াসহ দলীয় কর্মকা-, শহীদদের বাড়িতে গমনসহ নানা আয়োজনে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার যেমন তাঁর নির্বাচনী এলাকা ডুমুরিয়া-ফুলতলায় কাটিয়েছেন তেমনি খুলনা-৬ আসনের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য খুলনা অঞ্চল সহকারী পরিচালক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ঈদ করেছেন কয়রা-পাইকগাছা এলাকায়। এমনিভাবে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরী আমীর অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান খুলনা-৩ ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরী সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল খুলনা-২ আসনের মধ্যেই নিজের কর্মকা- সম্পন্ন করেছেন। অন্যান্য আসনের মধ্যে খুলনা-১ এ মাওলানা শেখ আবু ইউসুফ ও খুলনা-৪ এ অধ্যক্ষ মাওলানা কবিরুল ইসলাম স্ব স্ব এলাকায় ঈদ করেছেন।

মহানগর বিএনপি’র সভাপতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, টানা তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণের ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতায় চেপে বসেছিল। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এবারই প্রথম ঈদ; যে ঈদে পুলিশী নির্যাতনের ভয় ছিল না বিএনপি নেতা-কর্মীদের। গেল ১৫ বছরের ঈদের দিনেও বাড়ি পুলিশ আসতো কোনো কোনো নেতা-কর্মীর বাড়িতে। ফলে গণহত্যাকারী মুক্ত বাংলাদেশে অন্যরকম ঈদ কেটেছে এবার।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, দেড় যুগ বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা-মামলার ‘স্টীমরোলা’র চালিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনের কারণে আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন ঘর-বাড়ি ছেড়েছিলেন নেতা-কর্মীরা। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এবারের ঈদ-উল ফিতরে শুধু বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নয়; সমগ্র বাংলাদেশে স্মরণকালের সর্বোচ্চ আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এবারের ঈদ-উল ফিতর সকলের কাছে একটা স্বস্তির ঈদ। দীর্ঘ ১৬ বছরের একটি কালো যুগ, একটি ফ্যাসিবাদী যুগ, একটি কর্তৃত্ববাদীকাল, একটা নির্যাতনের যুগ, খুন-হত্যা-ক্রসফায়ারের যুগ, অধিকারের-বঞ্চনার যুগ আমার পার হয়েছি। তার থেকে মুক্তির কারণে মানুষের হৃদয়ে যে স্বস্তি বিরাজ করছে; এটা হল সেই স্বস্তির ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ; প্রকৃত আনন্দ, কুরআনের বিধান মেনে চলার আনন্দ। রোযা পালনের আনন্দ, সমাজের গরীব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে আনন্দ-এটিই হলো প্রকৃত ঈদ।

অপরদিকে, ধ্বংসস্তূপের মাঝে ভগ্নাংবশেষ দাঁড়িয়ে আছে নগরীর শেরে বাংলা রোডের ‘শেখবাড়ি’টি। শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্রদের বাসভবন শেখবাড়ি ঘিরেই পদ্মার এপাড়ের রাজনীতি, প্রশাসনের বদলী-পদোন্নতি, নিয়োগ বাণিজ্য-টেন্ডার সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো। এ বাড়িটিতে বসবাস করতেন সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, সেখ সালাউদ্দিন জুয়েল ও সারহান নাসের তন্ময়, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বিসিবি’র পরিচালক শেখ সোহেল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন গ্রুপের সভাপতি শেখ জুয়েল ও তাদের সহোদর বাবু। রাজনৈতিক অসীম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এই শেখ বাড়িটি গেল বছরের ৪ ও ৫ আগস্ট দফায়-দফায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছিল বিক্ষুব্ধরা। আর অব্যাহতিপ্রাপ্ত কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদের গনন বাবু রোডস্থ বাস ভবনেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। বর্ষিয়ান রাজনীতিক তালুকদার আব্দুল খালেকও তার স্ত্রী হাবিবুন নাহারের ৭টি ব্যাংক হিসাব ও তিনটি সঞ্চয়পত্রে (৮ কোটি ১০ লাখ ২৯ হাজার টাকা জমা) ফ্রিজ করেছে দুদক। খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির ২২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকটি মামলা হয়েছে খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সাইফুল ইসলামের নামে। তাছাড়া ৫ আগস্টের পর খুলনা মহানগরীতে কয়েকটি রাজনৈতিক মামলায় আসামী করা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এসব আত্মগোপনে থাকা নেতাদের বাড়িতে ঈদে আনন্দ পৌঁছায়নি। একই অবস্থা ছিল খুলনা আওয়ামী লীগের সাবেক অন্য সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান ও রাজনীতিক শীর্ষ নেতাদের বাড়িতে।