মো. রেজাউল বারী বাবুল, স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর : গাজীপুর মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসন, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯টি খাল পুনঃখননের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতা-যে খাল ও নদীগুলো পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, সেই সব নদী-খাল এখন শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, নগরের নর্দমা পানি এবং অবৈধ দখলের কারণে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। ফলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও দখল উচ্ছেদ ছাড়া শুধু খনন কার্যক্রম আদৌ টেকসই সমাধান দিতে পারবে কি না।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের তালিকা অনুযায়ী মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ ১৯টি খাল হলো আমবাগ খাল, বাংলাগাছ খাল, বেক্সিমো খাল, চিলাই খাল শাখা, চিলাই খাল, গাজীপুরা খাল, গুটিয়া খাল, হায়দারাবাদ খাল, ইছালী খাল, জুরুন খাল, করানদিয়া খাল, কাথোরা খাল, মইরান খাল, মগর খাল, মরা খাল, নাগদা খাল, নাগপাড়া খাল, পাজুলিয়া খাল ও ভাদাম খাল। এসব খাল মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও জোনজুড়ে বিস্তৃত এবং নগরের পানিপ্রবাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী এসব খালের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য শত কিলোমিটারেরও বেশি। এর মধ্যে চিলাই খাল শাখার দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার এবং মূল চিলাই খালের দৈর্ঘ্য ৩৪ কিলোমিটারের বেশি। মগর খাল প্রায় ১০ কিলোমিটার, হায়দারাবাদ খাল প্রায় ৬ কিলোমিটার, কাথোরা খাল প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং মরা খাল প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। অন্যান্য খালগুলোর দৈর্ঘ্য ১ থেকে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে এবং প্রস্থ ২ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। দীর্ঘদিন অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নজরদারির অভাবে এসব খালের অনেকাংশই ভরাট হয়ে গেছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে।

বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। টঙ্গী, চন্দনা চৌরাস্তা, জয়দেবপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য এবং নগরের নর্দমার ময়লা সরাসরি চিলাই নদসহ বিভিন্ন নদী ও খালগুলোতে গিয়ে পড়ছে। এতে পানির রং কালচে হয়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে তীব্র দুর্গন্ধ, এবং অনেক স্থানে পানি স্থির হয়ে পচে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় খাল ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা, দোকানঘর, গ্যারেজ, এমনকি স্থায়ী বসতবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ফলে খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করছে।

গাজীপুর মহানগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কানাইয়া এলাকার কৃষক আব্দুস সুবহান বলেন, ‘একসময় ফাল্গুন চৈত্র মাসে টিউবওয়েলের পানি শুকিয়ে গেলে আমরা চিলাই নদীর পানি পান করে মাঠে কাজ করতাম। এখন সেই নদীর পানি এতটাই দূষিত যে নদীর পাড় দিয়ে হাঁটাও কষ্টকর, নদীর পানি গায়ে লাগলে ফোসকা পড়ে যায়-এটি আমাদের জীবিকার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

নাসারান এলাকার শতবর্ষী বাসিন্দা চন্দ্র দাস বলেন, ‘এই নদী একসময় আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এই নদী ও বিলের মাছ ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা জীবিকা নির্বাহ করেছে। আমাদের সময়ও ছিল দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছে ভরপুর। এখন সেটি বিষাক্ত স্রোতে পরিণত হয়েছে। নদীর এই অবস্থা আমাদের অতীতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।’

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকার বলেন, ‘খাল পুনঃখনন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর প্রকৃত সুফল পেতে হলে দূষণের উৎস বন্ধ করা অপরিহার্য। এজন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে আমরা তা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাব। এখন সরকার উদ্যোগ নিয়েছে খিল খনন করার আমরা খনন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় সে বিষয়ে কাজ করছি। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর মনিটরিং জোরদার করবো। পরিবেশ দূষণে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়েও আমরা কঠোর অবস্থানে থাকবো। একই সঙ্গে খালগুলোর সার্ভে করে সঠিক অবস্থান শনাক্তকরণ ও সীমানা নির্ধারণ করে দখলমুক্ত করা এখন জরুরি। এই কার্যক্রমকে টেকসই করতে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে।’

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু খাল খনন নয়, একটি সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দখলমুক্তকরণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমান গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে খালগুলোর অবস্থান স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনোভাবে দখল বা বিকৃতি ঘটলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।’

জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নদী ও খাল রক্ষায় প্রশাসন এককভাবে সফল হতে পারবে না। শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দূষণের উৎস শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি দখলদারদের উচ্ছেদেও সমন্বিত অভিযান চালানো হবে।’

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, শিল্পবর্জ্যে দূষিত মাটিতে পরীক্ষায় দেখা গেছে, সেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর ভারী ধাতু রয়েছে। এসব মাটিতে উৎপাদিত ফসল মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, মোঃ মনির হোসেন বলেন, ‘খাল খনন উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক, তবে এটি যেন কেবল প্রকল্পভিত্তিক সীমাবদ্ধতায় আটকে না থাকে। খালগুলোকে দখলমুক্ত করা, দূষণের উৎস স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং একটি কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর খনন করলেও বাস্তবে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। নদী ও খালকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।’

পরিবেশবিদরা বলছেন, গাজীপুরের খাল ও নদীগুলো কেবল জলাবদ্ধতা নিরসনের অবকাঠামো নয়, এগুলো কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং নগরের পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রাণ। তাই খাল পুনঃখননের এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে দূষণ বন্ধ, দখল উচ্ছেদ, কঠোর মনিটরিং, আইনের প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা-সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

চিলাই নদীসহ গাজীপুরের খাল-নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা এখন একটি কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি-একদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা, অন্যদিকে অব্যাহত দূষণ ও দখল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে খাল পুনঃখনন প্রকল্প কেবল সাময়িক সমাধান হিসেবেই থেকে যাবে, আর এক সময়ের প্রাণবন্ত জলপথগুলো হারিয়ে যাবে নগরায়নের চাপে।