তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : পুকুর খননের কারণে শুধু যে আবাদি জমি কমছে তা নয়; শত শত ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে পড়েছে। তাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা জমিতে এক ফসলের বেশি বা অনেক জমিতে কোনো ফসল আবাদ করতে পারছেন না। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া উপজেলা এলাকায় গত দুই দশকে তিন ফসলি জমিতে শত শত পুকুর খনন করা হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার স্থানীয় তথ্যচিত্র অনুযায়ী পুকুর খননের ঘনঘটায় এরই মাঝে চলনবিলের প্রাচীন মানচিত্র পাল্টে গেছে। দুই দশকে চলনবিলে আটটি উপজেলা এলাকায় ২০-২৫ হাজার পুকুর খনন হয়ে গেছে। পাশাপাশি বর্তমানেও বিল এলাকার বিভিন্ন উপজেলার ফসলি মাঠে প্রতিবছর নতুন করে আরও ৬০০ থেকে ৭০০ পুকুর খনন করা হচ্ছে। ফলে চলনবিলের মোট আবাদি জমির পরিমাণ গত ২০ বছরে প্রায় আট হাজার হেক্টর কমে গেছে। বিশেষ করে ধনাঢ্য কৃষক; যাদের একই স্থানে তিন থেকে পঞ্চাশ-ষাট বিঘা পর্যন্ত জমি আছে তারা পুকুর খনন করে তা মৎস্যজীবীদের কাছে লিজ দিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। তারা আবাদি জমি কমে আসা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া, দেশীয় মাছের উৎপাদন কমে আসা, পুষ্টিকর ধানের আবাদ না হওয়া, দেশি বা অতিথি পাখির খাদ্য সংকট বা বিচরণের স্থান সংকুচিত হওয়া, জলাবদ্ধতা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন। বর্তমানে নানা অভিযান ও উদ্যোগের মাঝেও চলনবিলের তাড়াশ, উল্লাপাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলা এলাকায় ৬০০ থেকে ৭০০ পুকুর খনন চলছেই।

আর বর্ধিষ্ণু চলনবিলের আদি মানচিত্রে হুড়াসাগর, করতোয়া, গুমানি, ফুলজোর, চিকনাই, সরস্বতী, ভদ্রাবতীসহ ২৯টির মতো নদী, আক্কেলের ডওড়, কাটেঙ্গার জলা, কিনু সর্দারের ধর, সাইড খাল, হক সাহেবের খালসহ শতাধিক নদী-খালের চলনবিল এখন পুকুর আর পুকুরে ভরা এক জনপদ। এ জনপদের মানুষ এখন পুকুর খননের কারণে জলাবদ্ধতার শিকার। খাদ্যশস্য উৎপাদন ঘাটতিতে পড়ছে। এ ছাড়া সরকারি জলাশয়, খাল, ব্রিজ, কালভার্ট হারিয়ে এককালের প্রসিদ্ধ নৌবন্দরগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে অনেকাংশে। এতে জলপথে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটার টান লক্ষ্যণীয়।

একসময়ের নদী, খালের মতো প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভরপুর চলনবিলের মাছ, পাখি, ধান বা ফসলের বনেদি অঞ্চলে অনাহূত পুকুর যেন বোঝা হয়ে পাল্টে ফেলছে দেশের বৃহত্তম বিলের প্রাচীন মানচিত্র। পুকুর খননকারীরা বিনা অনুমতিতে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, পুকুর কাটার পরও পুকুরের দরে ভূমি কর না দিয়ে ফসলি জমির জন্য নির্ধারিত দরে ভূমি কর দেয়াসহ নানা অপরাধ করছেন, যা বন্ধ হওয়া জরুরি। শুধু তাই না, এ অঞ্চলে পুকুর খননের লাগাম অতি দ্রুত না টানলে চলনবিলের মানচিত্রই থাকবে না- এমন উদ্বেগ সচেতন চলনবিলবাসীর। তাই বন্ধ হোক চলনবিলে পুকুর খনন। শুভবুদ্ধির উদয় হোক পুকুর খননকারীদের। এ ব্যাপারে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন পুকুর খনন বন্ধে সর্বত্র সজাগ এবং আইনগত পদক্ষেপ নিতে মোবাইল কোর্ট অব্যাহত আছে।