বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির আধারগুলো সংকুচিত হওয়ার কারণে হুমকির মুখে বরেন্দ্রের ফসল আবাদ। এই সংকটের মধ্যেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চালানো হচ্ছে মিনি পাওয়ার পাম্পে সেচ দেয়া অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের খাদ্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভে পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গত তিন দশকে পানির স্তর ৮ থেকে ১৮ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। বিপজ্জনক ঘটনা হলো, বরেন্দ্রের কোথাও কোথাও পানির স্তরই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে বোরো চাষের এলাকা সংকুচিত করে ফেলতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮টি উপজেলায় বোরো চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিএমডিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর, চাপাঁইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একাংশ, নাচোল, গোমস্তাপুর ও নওগাঁর সাপাহার, পোরশা এবং নিয়ামতপুর উপজেলা সবচেয়ে বেশি পানি সংকটে পড়েছে। এসব উপজেলার বেশির ভাগ গভীর নলকূপেই আর পানি মিলছে না। আর হস্তচালিত প্রায় টিউবওয়েলগুলোই অনেক আগেই অকেজো হয়ে গেছে। ফলে খাবার পানির সংকট মেটাতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছেন স্থানীয়রা। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ২৫টি উপজেলায় ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, এই অঞ্চলে গড় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত তিন দশকে ৮ থেকে ১৮ মিটারে নেমে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মতো কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় গড় ভূূগর্ভস্থ পানি ২১ মিটার থেকে ৪৬.৮৭ মিটারে নেমে এসেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী অঞ্চলের ৪১টি ইউনিয়নকে ইতোমধ্যে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও অবৈধভাবে মিনি পাম্প বসিয়ে সেচ কার্যক্রম থামছে না। গৃহস্থালি ব্যবহারের অজুহাতে কৃষকরা বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে এসব পাম্পের মাধ্যমে জমিতে দেদারসে পানি তুলছেন।
পানির স্তর ক্রমাগত নিম্নমুখি
এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জাতীয় গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় কম হওয়ার কারণে পানির স্তর বর্ষা মওসুমে আর আগের জায়গায় উঠে আসছে না। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে প্রতিদিন ৯৫ হাজার ঘনমিটার পানি তুলছে রাজশাহী ওয়াসা। ফলে ভয়াবহ খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বরেন্দ্র অঞ্চলে অধিক পরিমাণ ধান চাষ হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিম্নমুখি হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে বৃষ্টিপাতের গড় পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে ১ হাজার ২০০ মিলিমিটার বা কোনো কোনো এলাকায় তারও কম বৃষ্টিপাত হয়। এ কারণে চাষাবাদের প্রয়োজনে যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই পরিমাণ পানি আর বর্ষা মৌসুমে ওপরে উঠছে না। ফলে পানির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা মানছে না মিনি পাম্পে সেচ
এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বরেন্দ্রে মিনি পাম্পে সেচ। বিএমডিএ’র একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন দিয়ে সেচের কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করলেও মাঠপর্যায়ে তা মানা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘অনেকেই গৃহস্থালির নামে মিনি পাম্প বসিয়ে পানি তুলছেন। অনুমতি ছাড়া মিনি পাম্প বসিয়ে বাণিজ্যিক সেচ দেয়ায় একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত কমছে, অন্যদিকে সরকারি গভীর নলকূপের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি বারবার জানানো হলেও পল্লী বিদ্যুৎ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। রাজশাহীর ৯টি উপজেলায় আড়াই হাজারের বেশি গভীর নলকূপ পরিচালনা করছে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তবে গৃহস্থালি সংযোগে কতোগুলো মিনি পাম্প সেচে ব্যবহার হচ্ছে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ না হলে রাজশাহীতে পানির সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।
সীমিত করা হয়েছে বোরো চাষ
আশির দশকে অবিভক্ত রাজশাহী বিভাগের ১৬ জেলায় সেচ কার্যক্রম শুরু করে বিএমডিএ। গভীর নলকূপ বসিয়ে শুরু হয় ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন। ফলে সারাবছরই ফসলের সমারোহে ভরে ওঠে বরেন্দ্রের মাঠ। ফসল উৎপাদনও বাড়ে কয়েকগুণ। তবে সে অবস্থা এখন আর নেই। সেই ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য। বছরের পর বছর ধরে পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-গর্ভস্থে পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। দিনকে দিন পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এমন কী কোনো কোনো উপজেলার কোথাও কোথাও মাটির নিচে পানির স্তরই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ৮টি উপজেলায় বোরো চাষ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএমডিএ। এসব উপজেলায় বিএমডিএর গভীর নলকূপের আওতাধীন কৃষি জমিগুলোতে বোরো চাষ এলাকাভেদে অর্ধেক থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হচ্ছে। বিএমডিএ কর্মকর্তারা বলছেন, একরকম বাধ্য হয়েই তারা আট উপজেলাকে পানিশূন্য হওয়া রোধ করতেই বোরো চাষ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আলোকে একটি নতুন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে পানি সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে একটি গভীর নলকূপ বছরে ৯৮০ ঘণ্টার বেশি চালানো যাবে না। পানি সংকটে থাকা আটটি উপজেলায় দুই দশমিক ১৯ লাখ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর জমি বিএমডিএর গভীর নলকূপের আওতাধীন। বাকি এক দশমিক ২৪ লাখ হেক্টর জমি বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন নলকূপের আওতাধীন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নলকূপ ২৪ হেক্টর থেকে ৪০ হেক্টর জমিতে পানি সেচ সরবারহ করতে পারে। বিএমডিএ’র নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখতে বছরে একটি গভীর নলকূপ মোট ১৯৬০ ঘণ্টা চালানো হবে। এরমধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত আসন্ন বোরো মৌসুমে একটি গভীর নলকূপ মোট ৯৮০ ঘণ্টা চলবে। ফলে এসব নলকূপের আওতাধীন জমিতে বোরো ধান চাষ অর্ধেক থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হচ্ছে।
আটটি উপজেলায় এক হাজার ৯৬০টি নলকূপ তীব্র পানি সংকটপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি নলকূপের আওতাধীন জমিতে কৃষকদের অনুরোধ করা হয়েছে বোরো ধান চাষ না করার জন্য। বাকি ৮৩০টি গভীর নলকূপের অর্ধেক জমিতে বোরো ধান এবং বাকি অর্ধেক জমিতে ভুট্টা ও গমের মতো অন্যান্য ফসল চাষ করার জন্যও কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ অন্যান্য ফসলের তুলনায় বোরো ধান চাষে পাঁচ থেকে ছয়গুণ বেশি পানির প্রয়োজন হয়। যেসব এলাকায় পানি সংকট সেসব এলাকার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।